আমাদের পাড়ার বিবিসি

আমাদের পাড়ার বিবিসি

শিক্ষা
Spread the love


সুনৃতা মাইতি

আমাদের গায়ে মাখা সেই মফসসলি গন্ধ উড়ে গেছে কি না জানা নেই, হয়তো গেছে, হয়তো নয়, কিন্তু মনের ভেতর লুকিয়ে আছে তার জাদু, সেই পাড়াজীবনের তুচ্ছ ধুলোখেলা, মায়াবী ছোটবেলার আলতো পরশ। সেই অকিঞ্চিৎকর স্মৃতিগুলোই যে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে কেই বা জানত!

জলপাইগুড়ি বাসের সেই বাইশ বছরের অধিকাংশ সময়ই কেটে গেছে দাদু-দিদার পাড়ায়। অদ্ভুত এক রকমের মায়া ছিল সেই পাড়ার আলসে জীবনে। সবাই সবাইকে চিনতেন, এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি বাটি চালাচালি হত ফি-দুপুরে। বিকেল হলেই পাড়ার অঘোষিত গার্জেন মানে ওই দাদু-দিদার দল বসে যেতেন আড্ডায়। আমার দিদার বাড়ি ছিল কাঠের তৈরি, তাতে প্ল্যাঙ্কিংয়ের মেঝে। বহু বছর আগে ভূমিকম্প আর বন্যার ভয়ে কাঠের বাড়ি তৈরির চল ছিল উত্তরবঙ্গে। তবে সে হলে কী হবে, বাড়ির সামনে সুপরিসর সিমেন্টের রোয়াক বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল আড্ডার্থে। সেই ঘনঘোর আড্ডায় জানা যেত সব বাড়ির হাঁড়ির খবর। কোন বাড়ির মেয়ে কার সঙ্গে প্রেম করে, কে বাড়ি থেকে টুক করে পালাল, কার বাপ-মা বৌবরণ করে নিল, এইসব তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল ছেলের বৌদের কৃতকর্মের ফিরিস্তি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাশুড়িদের যুগ তখনও শেষ হয়নি, তাই বৌমাদের বিশেষ জারিজুরি খাটত না। একেকজন দিদা-ঠাম্মা ছিলেন জলজ্যান্ত বিবিসি কিংবা আল জাজিরা।

একজন দিদার নাকি ‘হাটের’ ব্যামো ছিল, যখনই দেখা হত, কেঁদে-ককিয়ে বলতেন, ‘আমি আর বেশিদিন নাই রে মনা, হাটে খুউব ব্যথা।’ খুব ছোট থেকেই, মানে জ্ঞান হওয়া ইস্তক ওই দুটি বাক্য শুনে শুনে সেই দিদার উল্লেখমাত্রেই বলে ফেলতাম, ‘ও আচ্ছা! ওই বেশিদিন থাকতে না পারা দিদার কথা হচ্ছে বুঝি!’ শান্ত-সৌম্য আলতা দিদার স্বামী ছিলেন ভয়ানক ঝগড়ুটে! আলতা দিদার ঝগড়ায় বিশেষ পটুত্ব ছিল না বলে ছেলের বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়ার দায়িত্ব স্বয়ং নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গণাদাদু। সেটি শুরু হলেই আমার দিদা বলতেন, ‘ওই শ্বশুর আর বৌয়ের ঝগড়া শুরু হল। আরেকটু জমুক, তারপর যাব থামাতে।’ সে এক আমোদ ছিল বটে! ঝগড়া দেখতে যাওয়া। বুলি পিসি এসেছেন বাপের বাড়ি, পুলু পিসে কীভাবে তাকে হাতে-নাতে ধরে ফেলেছেন কুটু কাকুর সঙ্গে প্রেম-প্রেম মুখে গল্প করতে। পিসের সঙ্গে পিসির সে কী ঝগড়া! সারা রাত ধরে ঝগড়া করেছেন, সকালে সেই ঝগড়া ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছে। তাই সকালসকাল গোটা পাড়া জড়ো হয়ে গেছে সেই ঝগড়ার সাক্ষী হতে। চন্দুকাকু ঘুম থেকে উঠে লুঙ্গি পরে নিমের কাঠি দিয়ে দাঁতন করতে করতেই চলে এসেছেন পাছে ঝগড়ার পয়েন্ট মিস হয়ে যায়। ঝগড়ার তীব্রতা বাড়লে জোরে-জোরে দাঁতন কামড়াচ্ছেন, কমলে ধীরে-ধীরে। এর মধ্যেই বেতো রোগী সুলো জেঠি বাতের ব্যথায় কাতর হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না বলে চটি খুলে বারান্দায় উঠে চেয়ারে বসে-বসে নির্বিঘ্নে ঝগড়া দেখছিলেন, ফেরার সময় বারান্দা থেকে নেমে চটি পরতে যাবেন, দেখেন চটিজোড়া হাওয়া। এই ডামাডোলে তাঁর চটিজুতো চুরি হয়ে গেছে। ব্যাস! ঝগড়ার দর্শক ও শ্রোতারা এইবার শার্লক হয়ে গেলেন। চটি চোরের খোঁজ শুরু হল।

পাশের পাড়ার শান্ত কাকু করতেন কাটুমকুটুমের কাজ। বাড়ি ভর্তি ছিল সব অসাধারণ শিল্পকর্ম দিয়ে। সেইসব কাজ কেউ দেখল না, ফেসবুক আসার আগেই শান্ত কাকু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। পাশের বাড়ির সুফলদা ফি-বছর ক্রিসমাস পার্টি দিতেন। ওকে কেউ সুফল বলত না, বলত, সুফ্লা। আমি একবার ওকে সুফলদা বলে ডেকে ফেলেছিলাম বলে, ও নিজের মাথা চুলকে অবাক হয়ে ভাবছিল, ঠিক কাকে ডাকছি! ওরা খ্রিস্টান ছিল না কিন্তু প্রত্যেক বছর পাড়ার সবাইকে ডেকে ক্রিসমাস পালন করত। দিদাদের দল সেই ক্রিসমাস পার্টিতে পৌঁছে গিয়ে বলতেন, ‘কই গো যিশুপূজার কেক প্রসাদ দাও, চাইখ্যা দেখি কেমন।’

পাশের বাড়ির দোলন তৈরি করত আশ্চর্য সব জিনিস! সাদা পর্দায় চলমান দৃশ্য, হাততালি দিলে আলো জ্বলা বাড়ি, আর অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি! একবার কালীপুজোর পাহাড়ের চুড়োতে শিবের মূর্তি লাগিয়েছিল, দেখি দেবাদিদেবের পেছনে একটা সরু নল ফিট করা। তারপর একটা সুইচ টিপতেই শিবঠাকুরের মাথার ওপর থেকে ফোয়ারা গজাল। আমরা তো হুব্বা আর কি! ‘শিবঠাকুরের মাথায় ফোয়ারা!’ এটা বলতে বলতে ছাগলের তৃতীয় বাচ্চার মতো নাচতে-নাচতে তূরীয় আনন্দে হাততালি দিতে লাগলাম। দোলন খুশি না, সে খুব গম্ভীর মুখে বলল, ‘ওইটা ফোয়ারা না, মা গঙ্গা, শিবের মাথা থেকে বাইর হইসেন, আর পাহাড়টা কৈলাস।’

দাদুর বাড়ির পেছনের স্কুলে পরীক্ষা হলেই টুকলি উৎসব হত। মাধ্যমিক বল কিংবা উচ্চমাধ্যমিক, পরীক্ষার্থী ছেলেপুলেদের টুকলি সাপ্লাইয়ের উৎসাহ ছিল দেখবার মতো। তখন মানুষ দেদার ফেল করত। ইংরেজি আর অঙ্কে ফেলের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। টুকলি উৎসব দেখার জন্য পাড়ার গলিতে বেঞ্চি পাতা হত। মশলামুড়িওয়ালা আর আচারওয়ালারা সেখানে ফেরি করতে বসে যেত। আমরা সেখানে বসে বসে আচার খেতে খেতে টুকলি সাপ্লাই দেখতাম। তো একবার জানলা দিয়ে টুকলি সাপ্লাই করার খুব চেষ্টা চলছিল, কিন্তু কড়া স্যর পড়েছেন ডিউটিতে, তারই মধ্যে অতি কষ্ট করে দুই-তিনখান ছোট টুকলি কাগজ একটি হাতে গুঁজে দেওয়া হল, কিছুক্ষণ পরে বোঝা গেল সেটা ওই স্যরের হাত। স্যর বললেন, ‘যাও এবার বাড়ি যাও, পেয়ে গেছি। খুব হেল্প হয়েছে।’

সন্ধ্যা হতেই পাড়ার ক্লাবঘরে নিয়মিত লুডো ও ক্যারমের আসর বসত। আর রাত গভীর হলেই রাস্তায় আনাগোনা বেড়ে যেত মাতাল কাকুদের। গভীর রাতের নিকষ গাম্ভীর্য ভেঙে তরল গানের কলি ভেসে আসত, ‘থোরী সি জো পিলি হ্যায়, চোরী তো নেহি কী হ্যায়…’। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ড্রেনে পড়ে যেতেন। ড্রেন থেকে তুলে আবার তাদের বাড়ি দিয়ে আসার মস্ত দায়িত্ব ছিল আমার সমাজসেবী বাবা ও কাকাদের।

ছেলেপুলে পাড়ার গলির মধ্যেই ফুটবল খেলত, এমনকি ক্রিকেটও। বল বেশিরভাগ গিয়ে পড়ত সেই ঝগড়ুটে গণাদাদুর বাড়িতে। গণাদাদু খাইয়েপনা মানুষ, বেশিরভাগ দিনই বল দিতে চাইতেন না। ছেলেপুলেদের খুব যন্ত্রণা দিতেন। নিত্য বল কেনা চাট্টিখানি কথা! সেকালের বাবারা অত উপুড়হস্ত ছিলেন না যে চাইলেই বল কেনার টাকা দিয়ে দেবেন। এই নিয়ে দাদু-দিদাদের বৈকালিক আড্ডায় ঘনঘোর আলোচনা হত। বাড়িতে বল পড়ার পক্ষে ও বিপক্ষে একটা ছোটখাটো বিতর্কসভাই হয়ে গেল একদিন। তো একজনকে পাঠানো হল গণাদাদুকে ডাকতে, সে গিয়ে দেখে গণাদাদু নেই। ওর নাতি পাঁচ বছরের ছোট্ট পুনু ইতিউতি খেলছিল, দাদু-দিদাদের ডাকে ছুটে এসে আগ বাড়িয়ে বলল, ‘দাদু তো ডাক্তার গেছে।’ বোঝা গেল, তাকে নিয়মিত হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, আর দাদুই তাকে নিয়ে যায়। আজ তার দাদু একা গেছে। জিজ্ঞাসা করা হল, কী অসুখ, পুনু বলে, ‘বার্ধক্য’। যতবার জিজ্ঞাসা করা হয়, ততবারই এককথা, ‘বার্ধক্য’। পাড়ার বুড়োবুড়িরা ভাবেন, বার্ধক্য তো সবারই। তাতে ওষুধ খাওয়ার কী আছে! সেকালে কথায় কথায় ওষুধ খাওয়ার অত চল ছিল না। যাই হোক, আলোচনা আবার বলের দিকে ঘুরে যায়। অমনি ছোট্ট পুনু চকচকে চোখে বলে, ‘মনে পড়েছে, মনে পড়েছে, দাদু ডাক্তারের কাছে বার্ধক্য ওষুধ নিতে যায়।’

এইসব স্মৃতিগুলো যে অমলিন থেকে যাবে কে জানত! কেই বা জানত, মেকি দুনিয়ার ধরাচুড়ো দেখে ক্লান্ত হতে হতে মানুষ ফিরে যেতে চাইবে সেইসব আমুদে স্মৃতির কাছে, সেইসব মায়ার বাঁধনে!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *