হিমাংশু সেন
উত্তরবঙ্গ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন এ অঞ্চলের রয়েছে অপরিসীম প্রাকৃতিক সম্পদ, সুবিস্তৃত অভয়ারণ্য, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সীমান্তঘেঁষা কৌশলগত অবস্থান; অন্যদিকে ঠিক তেমনই রয়েছে স্থানীয় যুবসমাজের কর্মসংস্থানের তীব্র চ্যালেঞ্জ, আধুনিক পরিকাঠামোর অভাব এবং পরিবেশগত গভীর সংকট। এই জটিল প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত ভারসাম্য রক্ষা করে উত্তরবঙ্গকে সামগ্রিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি পরিবেশবান্ধব, সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা অত্যন্ত প্রয়োজন। নবনিযুক্ত পর্যটনমন্ত্রীর হাত ধরে এই রূপরেখা বাস্তবে রূপ পাবে— এমনটাই উত্তরের আপামর মানুষের প্রত্যাশা।
নবনির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চিত ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত উত্তরের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী ও চাঙ্গা করে তোলার। বন্ধ ও রুগ্ন চা বাগানগুলি খোলার ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়ে ইতিমধ্যে সরকারি স্তরে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু যে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের জীবিকা সুরক্ষিত করবে তা-ই নয়, বরং ডুয়ার্সের চা নির্ভর সামগ্রিক অর্থনীতিকেও পুনরুজ্জীবিত করতে প্রভূত সাহায্য করবে। তবে, এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত ও মসৃণভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সরকার, বাগান মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও জোরদার ত্রিপাক্ষিক সমন্বয় গড়ে তোলা দরকার। একইসঙ্গে প্রথাগত চায়ের ব্যবসার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে ‘টি ট্যুরিজম’ বা চা পর্যটনকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা যায়, তা নিয়ে ভাবার এখনই উপযুক্ত সময়।
বাস্তবতা হল, ডুয়ার্সের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে আমরা আজও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের চাহিদা ও মানসিকতায় আমূল বদল এসেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব আবাসন, পর্যাপ্ত তথ্যকেন্দ্র, সর্বক্ষণের ডিজিটাল গাইডেন্স, প্লাস্টিকমুক্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের পর্যটন সুবিধা ছাড়া কোনও অঞ্চলই দীর্ঘমেয়াদে পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রাখতে পারে না। ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিঃসন্দেহে অনন্য ও তুলনাহীন, কিন্তু সেই আদিম ও অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে বিশ্বমানের আধুনিক পর্যটন পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ভারত-ভুটান সীমান্ত করিডরগুলির আধুনিকীকরণ ও সামগ্রিক উন্নয়ন। জয়গাঁ-ফুন্টশোলিং, চামুর্চি-সামসি, জিতি কিংবা কালিখোলা-লামিজংখার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারগুলি ভুটানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত নান্দনিক ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে তারা তাদের অনন্য বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাও কার্যকর করেছে। ফলে সীমান্ত পেরিয়েই পর্যটকরা একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ অভ্যর্থনা অনুভব করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভারতীয় অংশে বহু ক্ষেত্রে এখনও কোনও স্থায়ী ও আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার গড়ে ওঠেনি। কোথাও বাঁশের তৈরি অস্থায়ী কাঠামো, কোথাও বা শুধুমাত্র এসএসবি-র অস্থায়ী ক্যাম্প চোখে পড়ে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘উন্নত ভারত’ গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা একটি দেশের ক্ষেত্রে এই চিত্র মোটেই শোভনীয় নয়। সীমান্ত প্রবেশদ্বারগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের ল্যান্ড পোর্ট বা সমন্বিত চেকপোস্টের আদলে পর্যটন ও বাণিজ্য করিডর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য এই অঞ্চলগুলির দ্রুত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
তবে, এই সমস্ত পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ডুয়ার্সের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও তার সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন রিসর্ট, হোমস্টে এবং বাণিজ্যিক পর্যটন আবাসন গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে অনেক নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ দপ্তর বা বন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমানসে বিভিন্ন সময়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরে এই অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’ বন্ধ করে দিচ্ছে, যা মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সংঘাত বাড়িয়ে তুলছে। এটি পরিবেশের ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ পর্যটন সম্ভাবনার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই এসব অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং পরিবেশ আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
উত্তরবঙ্গের পর্যটন প্রসারে একসময় উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা পরিচালিত ‘সবুজের পথে হাতছানি’ বাস সার্ভিসটি ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। পর্যটকদের জন্য দক্ষ গাইড, সুসংগঠিত রুট এবং সরকারি নিরাপত্তা ডুয়ার্সভ্রমণকে মধ্যবিত্তের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে লাভজনক এই পরিষেবাগুলি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। আজ যখন নতুন পর্যটনমন্ত্রীর নেতৃত্বে পর্যটনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তখন এই ঐতিহ্যবাহী পরিষেবাগুলিকে আধুনিক রূপে, বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক বাস বা ওপেন-রুফ ট্যুরিস্ট বাসের মাধ্যমে পুনরায় চালু করার সময়োপযোগী পদক্ষেপ করা যেতে পারে। রেলের এনজেপি-আলিপুরদুয়ার ভিস্টাডোম ট্যুরিস্ট স্পেশাল ট্রেনটি পর্যটকদের প্রিয়। নতুন পর্যটনমন্ত্রী শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ির মধ্যে ‘আরবান রেল’ বা শহরতলির রেল যোগাযোগের যে দূরদর্শী প্রস্তাবটি রেলমন্ত্রককে দিয়েছেন, তা কার্যকর করা হলে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। প্রতিদিনের রুজিরুটির টানে এবং বিভিন্ন কাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত করেন। এই শহরতলি রেল ব্যবস্থাটি চালু হলে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি যমজ শহর কলকাতার মতোই একটি গতিশীল রূপ পাবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে শিলিগুড়ি জংশন ও এনজেপি এবং অন্যদিকে বাগডোগরা ও গুলমার মধ্যে একটি বাইপাস রেললাইনের চমৎকার পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এর মূল সুবিধা হল, এই লাইনে চলাচলকারী ট্রেনগুলিকে আর এনজেপির মূল জংশনের যানজটে ঢুকতে হবে না। যাত্রীরা শহরের আলাদা কোনও পয়েন্ট বা নতুন স্যাটেলাইট স্টেশন থেকে সরাসরি এই ট্রেনে যাতায়াত করতে পারবেন। এমনকি ডুয়ার্স থেকে যে ট্রেনগুলি শিলিগুড়ি জংশনে গিয়ে শেষ হয়, সেগুলি জংশনের ওপর বাড়তি চাপ না বাড়িয়ে সরাসরি বাইপাস দিয়ে বাগডোগরার দিকে চলে যেতে পারবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এই আরবান রেল রুটের সঙ্গে নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ময়নাগুড়ি এবং ধূপগুড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা ও ব্লক শহরগুলিকে যুক্ত করা হলে সমগ্র উত্তরবঙ্গের কয়েক লক্ষ মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। সেবক-রংপো রেলপ্রকল্পের পরিবেশগত ক্ষতিপূরণস্বরূপ বনসৃজনের জন্য গরুমারা জাতীয় উদ্যানের লাগোয়া প্রায় ২০ একর জমি বরাদ্দ হয়েছে, যার ফলে গরুমারা জাতীয় উদ্যানের বনাঞ্চলের প্রসার ঘটবে। পরিবেশ সংরক্ষণের এমন দূরদর্শী উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। পাশাপাশি, হাসিমারা সামরিক বিমানঘাঁটিকে কেন্দ্রীয় ‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতায় এনে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ঘোষণা এই অঞ্চলের যোগাযোগের মানচিত্রকে বদলে দেবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি সমন্বিত নীতির ওপর, যেখানে চা শিল্প, বনজ সম্পদ, পর্যটন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। বহু পুরোনো ‘টি-টিম্বার-ট্যুরিজম’ ধারণাকে বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্বিবেচনা করে ‘টি-ইকোলজি-ট্যুরিজম’ (চা-পরিবেশ-পর্যটন) মডেলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে আগামীদিনের মূল পথনির্দেশক। পরিবেশ-রাজনীতি বা ‘ইকো-পলিটিক্স’ আজ আধুনিক বিশ্বের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা, রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং পর্যটন শিল্পনির্ভর টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
(লেখক জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের (জলপাইগুড়ি) ভাইস প্রিন্সিপাল)
