বাইরে থেকে দেখলে সব স্বাভাবিক। নিয়ম করে স্কুলে যাচ্ছে, অফিস করছে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করছে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, সোশাল মিডিয়াতেও সক্রিয়। অথচ সেই মানুষটির ভিতরেই হয়তো চলছে এক অন্য লড়াই। একাকিত্ব, হতাশা, অসহায়তা বা প্রবল মানসিক চাপ— যার খবর আশপাশের মানুষ অনেক সময়ই টের পান না। সাহায্যের প্রয়োজন হলেও মুখ ফুটে বলতে পারেন না তিনি।
তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রথম ধাপ সবসময় কোনও বড় পদক্ষেপ নয়। কখনও তা শুরু হতে পারে একটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে—‘তুমি ঠিক আছ তো?’
আরও পড়ুন:
আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এই দিনটিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের আগে অনেক ক্ষেত্রেই কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সেই বদলগুলি খেয়াল করা, মানুষটির সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:

আচরণ, কথাবার্তায় হঠাৎ পরিবর্তন অবহেলা নয়
মানসিক কষ্ট সবসময় চোখে দেখা যায় না। তবে আচরণে কিছু পরিবর্তন তার ইঙ্গিত দিতে পারে। যেমন, হঠাৎ পরিবার বা বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, আগে যে কাজগুলি ভালো লাগত সেগুলিতে আর আগ্রহ না থাকা, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া, অস্বাভাবিক রাগ বা বিরক্তি, পড়াশোনা বা কাজে মন বসতে না চাওয়া বা বারবার হতাশার কথা বলা।
‘আমি সবার বোঝা’, ‘আমাকে ছাড়া সবাই ভালো থাকবে’— এই ধরনের কথা শুনলে তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। অনেক সময় এমন মন্তব্যকে ‘নাটক’, ‘মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা’ বা সাময়িক মন খারাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর পিছনে গভীর মানসিক যন্ত্রণা থাকতে পারে।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে আচরণের পরিবর্তনকে অবহেলা না করাই ভালো। হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের এড়িয়ে চলা বা নিজের পছন্দের কাজ থেকে সরে যাওয়াকে শুধুই ‘বদমেজাজ’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সরাসরি প্রশ্ন করতে ভয় নয়
অনেকের মনে প্রশ্ন, কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবছেন কি না, সরাসরি জানতে চাওয়া কি তাঁর মাথায় সেই চিন্তা ঢুকিয়ে দিতে পারে? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, না। বরং এমন প্রশ্ন তাঁকে বোঝাতে পারে যে তাঁর কষ্ট কেউ দেখতে পাচ্ছেন এবং তাঁর কথা শোনার জন্য কেউ প্রস্তুত। তাই প্রয়োজন হলে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা যায়, ‘তোমার কি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা মনে হচ্ছে?’
প্রশ্নটি করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তাঁর কথা শোনা। সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘শক্ত হও’, ‘এত ভাবছ কেন’, ‘অন্যদের তো আরও বড় সমস্যা আছে’—এই ধরনের কথা তাঁর কষ্টকে ছোট করে দিতে পারে। তুলনা বা বিচার না করে তাঁকে নিজের কথা বলতে দিন। কখনও কখনও মানুষটির প্রয়োজন শুধু এটুকুই, কেউ তাঁর কথা মন দিয়ে শুনুক এবং তাঁকে একা মনে না হতে দিক।
কিশোরদের চাপটা বুঝতে হবে
শুধু বড়দের নয়, মানসিক চাপ বাড়ছে ছোটদের মধ্যেও। পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের সমস্যা, সহপাঠীদের হেনস্থা, পারিবারিক অশান্তি এবং সমাজমাধ্যমে অন্যের সঙ্গে ক্রমাগত তুলনা—সবই কিশোর-কিশোরীদের মনে চাপ তৈরি করতে পারে।
‘ভালো ফল করতেই হবে’, ‘অন্যদের মতো হতে হবে’—এই প্রত্যাশার ভার অনেক সময় তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই বাবা-মা, শিক্ষক এবং বন্ধুদের উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নিজের ভয়, ব্যর্থতা বা মন খারাপের কথা বললে তাকে বকাঝকা বা বিচার করা হবে না।

সংকট বুঝলে একা ছাড়বেন না
কেউ যদি আত্মহত্যার কথা বলেন, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেন অথবা মনে হয় তিনি নিজের ক্ষতি করতে পারেন, তাঁকে একা রাখা উচিত নয়। দ্রুত পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা বা জরুরি চিকিৎসার সাহায্য নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্য বা কাছের মানুষকে বিষয়টি জানানো জরুরি, যাতে তাঁকে নিরাপদে রাখা যায়।
মনোবিদদের কথায়, কেউ ভিতরে ভিতরে কী কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন, তা আমরা সবসময় বুঝতে পারি না। কিন্তু তাঁর আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারি, প্রশ্ন করতে পারি এবং তাঁর কথা শুনতে পারি। আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব নয়। পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী—প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। কারও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে, তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়। হয়তো আপনার একটি প্রশ্নই তাঁকে কথা বলার সুযোগ দেবে। ‘তুমি ঠিক আছ তো?’ কখনও কখনও এই চারটি শব্দই পারে কারও জীবন বাঁচাতে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
