- দীপংকর হালদার
সান ফ্রান্সিসকোর এক সাদামাঠা ভাড়াবাড়ি। জানলার ধারে বসে কফি খাচ্ছেন এক নবতিপর মানুষ। পরনে ইস্ত্রিহীন শার্ট, চোখে সস্তা ফ্রেমের চশমা, আর হাতে ১৫ ডলারের একটা ক্যাসিও ঘড়ি। কেউ দেখলে ভাববেন, হয়তো কোনও অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক বা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। কিন্তু এই মানুষটির জীবনকাহিনী শুনলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। ইনি চার্লস ‘চাক’ ফিনি। একসময় যিনি ছিলেন ‘ডিউটি ফ্রি শপার্স’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যার হাতের মুঠোয় ছিল অফুরান সম্পদ। অথচ ২০২৩ সালে যখন তিনি ৯২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তাঁর পকেটে আর কানাকড়িও ছিল না। তিনি দেউলিয়া হননি, জুয়া খেলে সব হারাননি; তিনি সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় নিজেকে ‘দরিদ্র’ করেছেন।
আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বে যেখানে সবাই আরও চাই, আরও চাই—এই ইঁদুর দৌড়ে মত্ত, সেখানে চাক ফিনি এবং তাঁর অনুসারীরা এক নতুন দর্শনের জন্ম দিয়েছেন। তার নাম— ‘গিভিং হোয়াইল লিভিং’ বা জীবদ্দশাতেই দান। মৃত্যুর পর উইলে সম্পত্তি দান করে যাওয়ার প্রথা ভেঙে, নিজের চোখের সামনেই উপার্জিত অর্থের সদ্ব্যবহার দেখে যাওয়ার এই যে আন্দোলন, তা আজ বিশ্বজুড়ে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।
দ্য সিক্রেট বিলিয়নিয়ার : এক অদ্ভুত জীবন
চাক ফিনির গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। আশির দশকে যখন তিনি ব্যবসায়িক সাফল্যের তুঙ্গে, তখন তাঁর মনে হল, ‘জুতো তো একজোড়াই পরব, তাহলে আলমারিতে দশ জোড়া সাজিয়ে রেখে লাভ কী?’ তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্পদ মানুষের জীবনে কেবল তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্যের কাজে লাগে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি গোপনে দান করে গিয়েছেন। এতটাই গোপনে যে, তাঁর দান গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তিনি শর্ত দিতেন—কখনও তাঁর নাম প্রকাশ করা যাবে না। তাঁর নাম প্রকাশ পেলে তিনি অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিতেন। এই অবিশ্বাস্য গোপনীয়তার জন্য তাঁকে বলা হত ‘ফিলানথ্রপির জেমস বন্ড’। ফোর্বস ম্যাগাজিন যখন বিশ্বের ধনীদের তালিকা তৈরি করত, তারা জানতই না যে ফিনির নামের পাশে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ তিনি অনেক আগেই দান করে দিয়েছেন।
তিনি তাঁর ফাউন্ডেশন ‘দ্য আটলান্টিক ফিলানথ্রপিস’-এর মাধ্যমে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি) দান করে গিয়েছেন। কোথায় গেল এই বিপুল অর্থ? ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনে। দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষায়। আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজের উন্নয়নে। আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে।
ফিনির জীবনযাপন ছিল তাঁর দানের মতোই চমকপ্রদ। তিনি সবসময় ইকনমি ক্লাসে যাতায়াত করতেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘প্লেনের সামনের সিট আর পেছনের সিট তো একই সময়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।’ দামি রেস্তোরাঁর বদলে তিনি পছন্দ করতেন রাস্তার ধারের স্যান্ডউইচ। নিজের গাড়ি ছিল না, বাসে চড়তেন। ২০২০ সালে তিনি তাঁর ফাউন্ডেশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেন, কারণ তাঁর সমস্ত টাকা দান করা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজের এবং স্ত্রীর শেষ জীবনের জন্য সামান্য কিছু অর্থ রেখে বাকিটা বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবদ্দশায় দান করার আনন্দই আলাদা। মৃত্যুর পর তো আর দেখা যায় না টাকাটা কী কাজে লাগল।’
দ্য গিভিং প্লেজ : ধনকুবেরদের নতুন শপথ
ফিনির এই দর্শন শুধু তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন বিশ্বের দুই শীর্ষ ধনী— বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেটকে। বাফেট একবার বলেছিলেন, ‘চাক ফিনি আমাদের সবার আদর্শ। তিনি যা করেছেন, আমরা হয়তো তা ভাবতেও ভয় পাই। তাঁর মতো মানুষ পৃথিবীতে বিরল।’
ফিনির অনুপ্রেরণাতেই ২০১০ সালে শুরু হয় ‘দ্য গিভিং প্লেজ’। এটি কোনও আইনি চুক্তি নয়, এটি একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি। বিশ্বের ধনকুবেররা এখানে প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁরা তাঁদের জীবদ্দশায় অথবা উইলে অন্তত তাঁদের সম্পত্তির অর্ধেক মানবকল্যাণে দান করে যাবেন।
আজ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন মার্ক জুকেরবার্গ, এলন মাস্ক, এবং ম্যাকেনজি স্কটের মতো নাম। বিশেষ করে আমাজনের সহ প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রাক্তন স্ত্রী, ম্যাকেনজি স্কটের দানের ধরন বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ডিভোর্সের পর পাওয়া বিপুল অর্থের মালিক হয়ে তিনি চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি গত কয়েক বছরে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং নিঃশব্দে কয়েক বিলিয়ন ডলার দান করেছেন। তাঁর দানের বিশেষত্ব হল, তিনি বড় বড় ইমারত বা মিউজিয়াম তৈরিতে টাকা দেন না; তিনি টাকা দেন ছোট ছোট এনজিও, ফুড ব্যাংক এবং তৃণমূল স্তরের সংস্থাগুলোকে, যারা সত্যিই সমাজের গভীরে কাজ করছে। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা মাঠে-ময়দানে কাজ করছে, টাকাটা তাদের হাতেই দেওয়া উচিত, এবং তাদের ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত।
অন্যদিকে, প্যাটাগোনিয়া-র প্রতিষ্ঠাতা ইভন চুইনার্ড এক ধাপ এগিয়ে এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ৮৩ বছর বয়সে তিনি ঘোষণা করেন, তিনি তাঁর তিন বিলিয়ন ডলারের পুরো কোম্পানিটিই দান করে দিচ্ছেন। কোনও ব্যক্তিকে নয়, তিনি তাঁর কোম্পানি দান করেছেন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য গঠিত একটি ট্রাস্টকে। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘এখন থেকে পৃথিবীই আমাদের একমাত্র শেয়ারহোল্ডার’—আজ কর্পোরেট জগতের কাছে এক বড় ধাক্কা।
ভারতের দানবীররা : ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ
দান বা পরোপকার ভারতীয় সংস্কৃতির রক্তে মিশে আছে। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে কূপ খনন, পাঠশালা তৈরি বা ক্ষুধার্তকে অন্নদানের প্রথা চলে আসছে। উনিশ শতকে টাটা গোষ্ঠী যে প্রাতিষ্ঠানিক দানের ধারা শুরু করেছিল, তা আজও ভারতের ফিলানথ্রপির মেরুদণ্ড। জামশেদজি টাটার দর্শন ছিল—সমাজের সম্পদ সমাজকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। সেই ঐতিহ্য বহন করেই রতন টাটা আজীবন আড়ালে থেকে কাজ করে গিয়েছেন।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের নতুন প্রজন্মের শিল্পপতিরা দানের সংজ্ঞাকে আরও প্রসারিত করেছেন। তাঁরা শুধু চেক লিখছেন না, তাঁরা সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছেন।
আজিম প্রেমজি : এক ঋষিপ্রতিম শিল্পপতি
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি জগতের অন্যতম পুরোধা উইপ্রোর আজিম প্রেমজিকে নিঃসন্দেহে ভারতের ‘চাক ফিনি’ বলা চলে। তিনি তাঁর মোট সম্পত্তির এক বিশাল অংশ, প্রায় কয়েক লক্ষ কোটি টাকা, ইতিমধ্যেই দান করেছেন। এবং তিনি থেমে নেই। ‘আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তিনি ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছেন।
প্রেমজির দর্শন খুব পরিষ্কার। তিনি মনে করেন, তাঁর এই বিশাল সম্পদ ঈশ্বরের আশীর্বাদ নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমরা সম্পদের ট্রাস্টি মাত্র।’ তাঁর মা ছিলেন একজন চিকিৎসক, যিনি সারাজীবন গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করেছেন। মায়ের সেই সেবার আদর্শই প্রেমজিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন, যাতে তাঁরা মাটির কাছাকাছি থাকতে পারেন।
শিব নাদার ও শিক্ষার বিপ্লব
এইচসিএল-এর প্রতিষ্ঠাতা শিব নাদার আর একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে একমাত্র শিক্ষাই পারে বৈষম্য দূর করতে এবং মানুষের ক্ষমতায়ন করতে। তাঁর ‘শিব নাদার ফাউন্ডেশন’ বিশ্বমানের স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বিদ্যাজ্ঞান’ স্কুলগুলোতে গ্রামের মেধাবী কিন্তু দরিদ্র ছাত্রছাত্রীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পায়। শিব নাদারের লক্ষ্য—গ্রামের ছেলেমেয়েদের এমনভাবে তৈরি করা যাতে তারা আগামীর নেতা হতে পারে। তিনি একে বলেন ‘ক্রিয়েটিভ ফিলানথ্রপি’ বা সৃজনশীল জনহিতৈষণা।
নিখিল কামাত : নতুন প্রজন্মের বার্তা
ভারতের কনিষ্ঠতম বিলিয়নিয়ার, জিরোধা-র সহ প্রতিষ্ঠাতা নিখিল কামাত সম্প্রতি ‘দ্য গিভিং প্লেজ’-এ স্বাক্ষর করেছেন। মাত্র ৩৫-৩৬ বছর বয়সে তিনি তাঁর সম্পত্তির বড় অংশ দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বড় বার্তা। তিনি দেখাচ্ছেন যে, দান করার জন্য বৃদ্ধ হওয়ার দরকার নেই; সাফল্যের শুরু থেকেই সমাজের কথা ভাবা যায়।
আলমা ম্যাটার : শেকড়ের টানে ফেরা
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ফিলানথ্রপিতে একটি চমৎকার ও আবেগঘন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে— নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ‘আলমা ম্যাটার’-কে ফিরিয়ে দেওয়া। যারা একসময় যে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন, তাঁরা এখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বিশাল অঙ্কের অনুদান দিচ্ছেন। আমেরিকায় হার্ভার্ড বা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় চলে প্রাক্তন ছাত্রদের অনুদানে। ভারতেও এখন সেই হাওয়া লেগেছে।
ইনফোসিসের সহ প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি আইআইটি বম্বের প্রাক্তনী। ঠিক ৫০ বছর আগে তিনি এই ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলেন। সেই সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২৩ সালে তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ৩১৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। এর আগেও তিনি ৮৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। তাঁর এই অনুদান গবেষণাগার তৈরি, হস্টেল উন্নয়ন এবং নতুন স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি চান, ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।
মাইন্ডট্রি-র সহপ্রতিষ্ঠাতা সুব্রত বাগচী এবং তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা বাগচী আইআইএসসি বেঙ্গালুরুতে একটি মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এবং স্নাতকোত্তর মেডিকেল স্কুল তৈরির জন্য ৪২৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। ওডিশার এক সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীর সন্তান সুব্রত বাগচী সবসময় বিশ্বাস করেন, ‘সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার জিনিস নয়।’
ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের সহ প্রতিষ্ঠাতা রাকেশ গাঙ্গওয়াল আইআইটি কানপুরকে ১০০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন মেডিকেল সায়েন্স এবং টেকনলজি স্কুল তৈরির জন্য। ইনফোসিসের আরেক সহ প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস গোপালকৃষ্ণান ব্রেন রিসার্চ বা মস্তিষ্ক গবেষণার জন্য আইআইএসসি-তে ৭৫ কোটি টাকা দিয়ে গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছেন। বার্ধক্যজনিত রোগ যেমন আলজাইমার্স বা ডিমেনশিয়া নিয়ে সেখানে বিশ্বমানের গবেষণা চলছে।
এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, ভারতের ধনীরা এখন বুঝতে পারছেন, দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি অনুদানের বাইরেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। তাঁরা চাইছেন তাঁদের দেওয়া অর্থে তৈরি হোক আগামীদিনের বিজ্ঞানী, গবেষক এবং সমাজ নেতারা।
দানের জগতে নারীদের ভূমিকাও আজ অগ্রগণ্য। রোহিনী নিলেকানি নিজে একজন সমাজকর্মী এবং লেখিকা। তিনি তাঁর ‘রোহিনী নিলেকানি ফিলানথ্রপিস’-এর মাধ্যমে পরিবেশ, জল এবং লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর দর্শন হল— ‘সমাজ, সরকার এবং বাজার’। তিনি মনে করেন, ভালো কাজের জন্য এই তিন শক্তির ভারসাম্য দরকার। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা দান করেছেন এবং অন্য নারীদেরও এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করছেন।
কেন এই পরিবর্তন? শূন্যতাই যখন পূর্ণতা
প্রশ্ন জাগতে পারে, হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন? কেন এই বিলিয়নিয়াররা তাঁদের হাড়ভাঙা খাটুনির টাকা এভাবেই বিলিয়ে দিচ্ছেন?
এর উত্তরে উঠে আসে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কারণ:
১. উত্তরাধিকারের বোঝা না রাখা : চাক ফিনি বা বিল গেটস মনে করেন, সন্তানদের জন্য পাহাড়প্রমাণ সম্পদ রেখে যাওয়া আসলে তাদের ক্ষতি করা। এতে তাদের কর্মস্পৃহা নষ্ট হয়, তারা অলস হয়ে পড়ে। ওয়ারেন বাফেটের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য— ‘সন্তানদের জন্য ততটাই রেখে যাও যাতে তারা মনে করে তারা যে কোনও কিছু করতে পারে, কিন্তু এতটাই বেশি রেখো না যাতে তারা মনে করে তাদের কিছুই করার দরকার নেই।’
২. জীবদ্দশায় প্রভাব দেখা : মৃত্যুর পর ট্রাস্ট কী করবে, বা টাকাটা ঠিকমতো খরচ হবে কি না, সেই দুশ্চিন্তার চেয়ে নিজের চোখে সমাজের পরিবর্তন দেখার আনন্দ অনেক বেশি। আজিম প্রেমজি যখন গ্রামের কোনও স্কুলে গিয়ে দেখেন তাঁর দেওয়া টাকায় বাচ্চারা কম্পিউটার শিখছে, তখন যে তৃপ্তি তিনি পান, তা কোনও ব্যালেন্স শিট দিতে পারে না।
৩. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আনন্দ : আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, টাকা উপার্জনে একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সুখ বাড়ে, তারপর তা আর সুখ দিতে পারে না। একে বলা হয় ‘হেডোনিক ট্রেডমিল’। কিন্তু দেওয়ার আনন্দ অফুরান।
চাক ফিনি যখন মারা যান, তখন সান ফ্রান্সিসকোর সেই ছোট ফ্ল্যাটে হয়তো অনেক কিছুই ছিল না। কোনও সোনার মেডেল ছিল না, কোনও রাজপ্রাসাদের চাবি ছিল না। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে আছেন। ভিয়েতনামের যে শিশুটি তাঁর টাকায় হার্ট সার্জারি করিয়ে বেঁচে উঠেছে, কিংবা আয়ারল্যান্ডের যে ছাত্রটি স্কলারশিপ পেয়ে বিজ্ঞানী হয়েছে—তাদের প্রার্থনায় তিনি অমর।
আজকের ভারত এবং বিশ্বের নতুন ধনীরা সেই পথেই হাঁটছেন। কেউ শিক্ষার আলো জ্বেলে, কেউবা মারণ রোগের প্রতিষেধক গবেষণায় টাকা ঢেলে, আবার কেউ নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বসেরা করার স্বপ্নে। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, কাফনের কাপড়ে পকেট থাকে না। তাই যতটুকু সময় হাতে আছে, তার মধ্যেই পৃথিবীটাকে একটু বাসযোগ্য করে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা।
শিকড়কে মনে রাখা আর সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি যদি বজায় থাকে, তবে হয়তো একদিন পৃথিবী থেকে ক্ষুধা, অশিক্ষা আর বঞ্চনার অন্ধকার দূর হবে। আর সেটাই হবে এই মহানুভব মানুষগুলোর জীবনের সেরা বিনিয়োগ। চাক ফিনি হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর জ্বালানো মশালটি আজ হাজারো হাতে ঘুরছে— এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।
(লেখক পেশায় অর্থনীতিবিদ)
