এত নজর দিতে হয়নি কখনও। এবার ভোট ঘোষণার আগে থেকে বিশেষ সতর্কতা যেন। কাউন্সিলার, সাংগঠনিক পদাধিকারী, তারও আগে বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ) প্রমুখকে নিয়ে বৈঠক করেছেন খোদ তৃণমূল নেত্রী। ভোট ঘোষণার পর মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসঙ্গে কর্মীসভা বুঝিয়ে দিচ্ছে ভবানীপুর নিয়ে শাসকদলের উদ্বেগ কতটা। নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বেগ থাকার জো নেই।
চিন্তার বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম শুভেন্দু অধিকারী। যাঁর ঝুলিতে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর রেকর্ড আছে। হতে পারে, ভোটের সেই ফলাফল নিয়ে তৃণমূলের অনেক অভিযোগ আছে, সাধারণ মানুষের সংশয় আছে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তৃণমূল জমানায় মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর অসম্ভবকে নন্দীগ্রামে সম্ভব করে দেখিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। সেকারণে ভবানীপুরে শুভেন্দু ভীতির প্রবল চাপ রয়েছে মমতার ওপর।
সেই চাপটা মমতা ও অভিষেকের কথাবার্তায় প্রতিফলিত হচ্ছে। রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের ভোট প্রচারটা বাস্তবে ভবানীপুর থেকে শুরু হল। দল যে কর্মসূচি প্রকাশ করেছে, তাতে পরিষ্কার যে, এরপর থেকে দুই শীর্ষ নেতা আলাদা আলাদাভাবে প্রচার করতে বাংলা চষে বেড়াবেন। অন্যান্যবার মমতা সবশেষে নজর দেন ভবানীপুরে। এবার ভবানীপুর থেকেই শুরু।
এমন নয় যে, ভবানীপুর হাতছাড়া হওয়া সম্পর্কে ভোট বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত। বরং নন্দীগ্রামে জিতলেও শুভেন্দুর ভবানীপুর দখল সম্পর্কে আমজনতার সংশয় আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এরকম কোনও জোরালো ইঙ্গিত নেই। তা সত্ত্বেও তৃণমূল ভবানীপুরের লড়াইটা আর আলাদাভাবে নিতে পারছে না। যে পাড়ায় মুখ্যমন্ত্রীর আকৈশোর বসবাস, সেখানেও বিশেষ সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
অভিষেক এমনকি জয়ের ব্যবধান পর্যন্ত ঠিক করে দিলেন ভবানীপুর দেখভালে নিযুক্ত দলের নেতা-কর্মীদের। নন্দীগ্রামে হারার পর উপনির্বাচনে প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে ভবানীপুরে জিতেছিলেন মমতা। উপনির্বাচনের ফলাফল শাসকদলের অনুকূলে যাওয়াই দস্তুর। একুশের নির্বাচন ধরলে কিন্তু ভবানীপুরে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান অনেকটাই কম। ওই আসনে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জিতেছিলেন ৩০ হাজার ভোটে।
তারও আগে মমতা ২০১৬-র নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ২৫ হাজার ভোটে। অর্থাৎ ভবানীপুর এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে রেকর্ড ভোটে জেতার রেকর্ড সাম্প্রতিক সময়ে ছিল না। ঘাড়ের ওপর শুভেন্দু চেপে বসায় তাই অভিষেককে মান বজায় রাখতে কলকাতার সব কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ভবানীপুরকে ফার্স্ট বয় করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিতে হল। তাঁর নির্দেশ, ব্যবধান যেন অবশ্যই ৬০ হাজারে তুলে দেওয়া হয়।
বাড়তি সতর্কতা হিসেবে ভবানীপুরে কর্মরত দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপরেও নজর রাখা হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হল। ঘটা করে এখন বলতে হচ্ছে, ভবানীপুরে মমতা সারাবছরই থাকেন। দলের নেতা-কর্মীদের শিথিলতা, নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কেও উল্লেখ করতে হল অভিষেককে। অহীন্দ্র মঞ্চে ভবানীপুরের সর্বশেষ কর্মীসভায় এমনকি মমতাও কাউন্সিলারদের নরম সুরে হলেও আত্মসমালোচনা করেছেন।
ইতিমধ্যে ভবানীপুরের জন্য তৃণমূলের আলাদা স্লোগান ঠিক করতে হয়েছে- বাংলার উন্নয়ন ঘরে ঘরে, ঘরের মেয়ে ভবানীপুরে। মমতাকে অহীন্দ্র মঞ্চের বৈঠকে নন্দীগ্রামের মতো লোডশেডিং করে দেওয়া হতে পারে বলে জুজু দেখাতে শোনা গিয়েছে। মমতার জন্য ভবানীপুর নিয়ে এরকম চাপ আগে কখনও নিতে হয়নি। শুভেন্দু জিতুন-হারুন, তাঁর উপস্থিতিটা যে উদ্বেগের, তা আর চাপা নেই।
