ক্যানসারের চিকিৎসায় শুধু ওষুধ, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপিই শেষ কথা নয়। চিকিৎসার ধকল সামলে রোগীর শরীরকে সক্ষম রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টি। খিদে কমে যাওয়া, হজমের সমস্যা বা চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ক্যানসার রোগী প্রয়োজনীয় খাবারটুকুও খেতে পারেন না। ফলে চিকিৎসার মাঝেই শারীরিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। তাই ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি ‘পথ্য’কেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন:
‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন আপডেট ২০২৬’-এর আলোচনায় উঠে এল ক্যানসার রোগীর পুষ্টি নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পিয়ারলেস হসপিটাল আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন আপডেট ২০২৬’-এর প্ল্যাটিনাম পার্টনার লালাবাবা রাইস।
আরও পড়ুন:
সম্মেলনের প্রথমদিন সায়েন্টিফিক সেশনে ক্যানসার চিকিৎসায় রোগীর খাবার ও পুষ্টির ভূমিকা এবং চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে পুষ্টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে আলোচনা হয়। সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য পেশ করেন পিয়ারলেস হসপিটালের গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. ভেঙ্কট রামন রামানান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন হসপিটালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডা. দেবী প্রসাদ সামাদ্দার।
পিয়ারলেস হসপিটালের কনসালট্যান্ট অঙ্কোলজিস্ট ডা. রাজীব ভট্টাচার্যের কথায়, ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীর ডায়েটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার্জারি, রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি, যে চিকিৎসাই চলুক না কেন, তার ধকল সামলানোর জন্য শরীরের যথেষ্ট সক্ষমতা প্রয়োজন। পুষ্টির ঘাটতিতে রোগী দুর্বল হয়ে পড়লে চিকিৎসায় বারবার বাধা তৈরি হতে পারে। তাঁর কথায়, ‘ওষুধ আর পথ্য দুটোই একসঙ্গে ঠিক না থাকলে রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ হতে পারবে না।’

ভাত কি ডায়েটে থাকবে? এ ব্যাপারে ডা. ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে ভাতের বদলে রুটি বা রুটির বদলে ভাত খেতেই হবে, এমন কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। রোগী যে খাবারে অভ্যস্ত এবং যা সহজে খেতে ও হজম করতে পারছেন, সেটিই তাঁর খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। কারণ ক্যানসার রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালরির প্রয়োজন থাকে। অথচ রোগের কারণে অনেকেরই খিদে কমে যায়, ফলে এমনিতেই খাবারের পরিমাণ কমে যায়।
পিয়ারলেস হসপিটালের অঙ্কোলজির ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ডা. মধুছন্দা কর বলেন, ভাত নিয়ে অনেক মিথ রয়েছে। বাঙালি মাছ-ভাত খাবে না, এটা তো ভাবাই যায় না। বাইরে কোথায় গেলেও আমরা ভাতেরই খোঁজ করি। আসল কথা ক্যালরি মেপে খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা। অর্থাৎ, দরকার পরিমিত পরিমাণে সুষম খাদ্যাভ্যাস।

কোনও রোগীর রুটি খেলে গ্যাস্ট্রাইটিস বা অন্য হজমের সমস্যা হলে ভাত খাওয়া যেতে পারে। সাদা চালের পরিবর্তে ব্রাউন রাইসও বেছে নেওয়া যায়। তবে শুধু কোনও একটি নির্দিষ্ট চালকে ক্যানসারের জন্য বিশেষ উপকারী ধরে নেওয়ার কারণ নেই। ব্ল্যাক রাইস নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। রোগীর সামগ্রিক পুষ্টির প্রয়োজনই এখানে মূল বিষয়।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা, ওজন কমানো বা শরীরচর্চার জন্য যে ধরনের ডায়েট করা হয়, ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। ১২ বা ১৮ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা, দিনে একবার খাবার খাওয়ার মতো নানা ধরনের ডায়েটের পরামর্শ সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেলেও ক্যানসার রোগীর জন্য তা উপযুক্ত নয়।
রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, ক্যানসারের ধরন এবং কোন চিকিৎসা চলছে, সবকিছু বিবেচনা করে নিউট্রিশনিস্ট বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শে খাদ্যতালিকা তৈরি করা উচিত। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ এবং জল, প্রতিটিরই প্রয়োজন রয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম, ভাত বা রুটি, সবকিছুরই জায়গা থাকতে পারে, তবে পরিমাণ নির্ভর করবে রোগীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপর।

ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে বাইরের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বাইরে খাবার কীভাবে তৈরি হয়েছে বা তার পরিচ্ছন্নতা কেমন, তা সবসময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। চিকিৎসাধীন রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. ভট্টাচার্যের পরামর্শ, বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর ও সহজপাচ্য খাবারই সবচেয়ে নিরাপদ। অতিরিক্ত তেল, ঝাল ও মশলা এড়িয়ে রোগীর সহনীয় খাবার দিতে হবে। এতে পুষ্টির জোগান বজায় রাখার পাশাপাশি চিকিৎসার ধকল সামলানোও সহজ হবে।
খাবারও চিকিৎসার অংশ। এই ভাবনাই এবার গুরুত্ব পেয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন আপডেট ২০২৬’-এ। সম্মেলনের সায়েন্টিফিক সেশনে ‘ফুড অ্যাজ মেডিসিন ইন ক্যানসার কেয়ার’ নিয়ে বক্তব্য রাখেন কোয়েম্বাটোরের পারিমস নিউট্রিশনের ডা. পারিমালা দেবী কুমারস্বামী। ক্যানসার চিকিৎসায় অঙ্গভিত্তিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে খাবারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালের চিফ ডায়েটিশিয়ান শিবশংকর তিম্মানপাতি।

ক্যানসার চিকিৎসায় প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন কলকাতার সিএনসিআই-এর পারমিতা দাস দত্ত। কখন এবং কেন টোটাল প্যারেন্টেরাল নিউট্রিশন বা টিপিএন প্রয়োজন হতে পারে, তা নিয়ে বক্তব্য রাখেন পিয়ারলেস হসপিটালের সঞ্চিতা শাহ। ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়েও ছিল বিশেষ পর্ব।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে একটি বিষয়, ক্যানসারের চিকিৎসা কোনও একক চিকিৎসকের কাজ নয়। অঙ্কোলজিস্টের পাশাপাশি নিউট্রিশনিস্ট, ডায়েটিশিয়ান, নার্স এবং অন্যান্য সহায়ক কর্মীদের সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের কথায়, ক্লিনিক্যাল ও নিউট্রিশন বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে রোগীর জন্য চিকিৎসা ও খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করলে রোগীর সামগ্রিক চিকিৎসা আরও ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সেই কারণেই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য এমন অ্যাকাডেমিক কর্মশালার গুরুত্ব রয়েছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
