অসুস্থ সংস্কৃতির চাষ

অসুস্থ সংস্কৃতির চাষ

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর থেকে তৃণমূলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের জেরে লাগাতার ধরপাকড় রাজ্য-রাজনীতির অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক, পুর প্রতিনিধি, পঞ্চায়েত স্তরের জনপ্রতিনিধি- কে নেই তালিকায়!

ক্ষমতাচ্যুত হতেই তৃণমূলের দুর্নীতির কঙ্কাল যেভাবে বেরিয়ে আসছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মানুষ যাঁদের ভরসা ও বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছিলেন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিলেন, তাঁদের বড় অংশের বিরুদ্ধে চুরি, দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে আমজনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযুক্ত নেতাদের লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান উঠছে। ক্ষোভের প্রকাশ এখন আর শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই। তা রূপ নিচ্ছে শারীরিক নিগ্রহ এবং চরম হেনস্তার। সম্প্রতি সোনারপুরে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আছড়ে পড়েছিল তথাকথিত জনরোষ। তাঁকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করার পাশাপাশি ডিম, ইট ছুড়ে মারা হয়।

অভিষেকের পাশাপাশি একাধিক নেতার একই পরিণতি লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রায় সবাইকে ডিম ছুড়ে মারা হচ্ছে। ঝাঁটাপেটা করা হচ্ছে, জুতোর মালা পরিয়ে মাথা কামিয়ে ঘোরানো হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ঘটছে অভিযুক্ত নেতাদের আদালতে পেশ করার সময় বা প্রিজন ভ্যানে তোলার মুহূর্তে। পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে ক্ষুব্ধ জনতার ডিম, জুতো কিংবা গোবর ছুড়ে মারা তথাকথিত স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পূর্বপরিকল্পনার ফসল, তা নিয়ে সংশয় আছে।

এই প্রবণতা কি আদৌ সুস্থ, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ সংগত হলেও প্রতিবাদের এই কুৎসিত রূপ সমর্থনযোগ্য নয়। কেউ দোষ করে থাকলে তাঁর বিচার হবে, শাস্তি হবে। তার জন্য পুলিশ, প্রশাসন, আদালত রয়েছে। কিন্তু মানুষ যেভাবে দুষ্টের দমন করতে নেমে পড়ছেন, তা ভয়াবহ অসুস্থ সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে।

কোনও সভ্য সমাজে কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। যেখানে দেশের বিচার ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে, পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে মুখোমুখি হাজির করাচ্ছে, সেখানে অভিযুক্তের গায়ে কাদা, গোবর কিংবা ডিম ছোড়ার সংস্কৃতি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট দুর্নীতি, তোলাবাজিতে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে কোমরে দড়ি বেঁধে তাঁদের এলাকায় ঘোরানোর মতো পুলিশের অতিসক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

স্পষ্টভাষায় হাইকোর্ট জানিয়েছে, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু তাঁকে জনসমক্ষে অপমান করা বা তাঁর মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করার অধিকার পুলিশের নেই। আইনেও তা নেই। হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সমাজের প্রতিটি স্তরের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

জনরোষের নামে এই ‘মব কালচার’কে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করা হলে অদূরভবিষ্যতে ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসতে বাধ্য। আজ যাঁরা ডিম বা জুতো ছুড়ে বাহবা কুড়োচ্ছেন, তাঁরা আসলে আইনের শাসনকে দুর্বল করছেন। রাজ্যের নতুন সরকার দাবি করছে, পশ্চিমবঙ্গে এতদিন শাসকের আইন চলত। এবার আইনের শাসন চলবে। এই বার্তার পরেও ডিম ছোড়ার সংস্কৃতিতে লাগাম পরানো না গেলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।

মানুষের ক্ষোভ, বিক্ষোভ থাকতেই পারে। গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলার অধিকার, বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার, প্রতিবাদের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, অভিযুক্তকে ডিম ছুড়ে মারতে হবে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে আইন-আদালত বা সংবিধানের তোয়াক্কা করা ছেড়ে দেবে মানুষ।

যে কোনও অভিযোগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিচার করার বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হলে তা সমাজকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে। ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার গণতন্ত্রে অনস্বীকার্য, কিন্তু তা যেন কোনওভাবেই সভ্যতা, শালীনতার লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম না করে। একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক এবং বহুত্ববাদী সমাজে প্রতিবাদের ভাষা হওয়া উচিত সংযত ও মার্জিত। উন্মত্ত ভিড়ের হাতে আইনের চাবুক তুলে দিলে তা কখনও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার সহায়ক হতে পারে না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *