মালদা: ইউপ খেয়েছেন কখনও? হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের। কচি বাঁশের শাঁস কুচিয়ে, তাতে সামান্য স্থানীয় মশলা ও ভেষজ পাতা দিয়ে এই সুপ তৈরি করা হয়। পাহাড়ি ঠান্ডায় শরীর গরম রাখতে এর জুড়ি মেলা ভার। পিকা পিলার নাম শুনেছেন? ফার্মেন্টেড বা গেঁজে ওঠা বাঁশের শাঁসের সঙ্গে শুকনো লংকা মিশিয়ে এই আচার বানিয়ে খান অরুণাচলপ্রদেশের আপাতানি উপজাতির বাসিন্দারা (Tribal Delicacies)। এর স্বাদ বেশ ঝাল এবং ঝাঁঝালো। আসলে অরুণাচলি হেঁশেলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হল ‘বাঁশের শাঁস’। অরণ্যনির্ভর এই রাজ্যের আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাঁশকে (Bamboo) প্রধান খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। শুধু মুখের স্বাদ বদলাতেই নয়, শরীরকে রোগমুক্ত ও চাঙ্গা রাখতেও এই বাঁশের পদগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রাকৃতিক উপায়ে ফার্মেন্টেড বা গেঁজে ওঠা বাঁশের শাঁসের পুষ্টিগুণের কথা তো সেখানকার বাসিন্দাদের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু ঠিক কী কী বন্ধু-ব্যাকটিরিয়া জন্মায় সেই বাঁশের শাঁসে? খুঁজবেন গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (College of Gour Banga) দুই অধ্যাপক।
সেই দুই গবেষক হলেন বোটানি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বিবেকানন্দ মণ্ডল এবং শারীরবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সন্দীপকুমার দাশ। তাঁদের এই গবেষণায় যুক্ত থাকবেন অরুণাচলপ্রদেশের রাজীব গান্ধি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন, কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন এবং অরুণাচলপ্রদেশের অ্যাগ্রিকালচার কলেজের আরও দুজন অধ্যাপক। সেই গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলজি মন্ত্রকের তরফে ৮২ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে। বাঁশের মধ্যে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া ‘বন্ধু’ ব্যাকটিরিয়ারা হৃদরোগ, কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ করতে কতখানি সক্ষম, সেই খোঁজ চালাবেন তাঁরা।
কীভাবে হয় সেই ফার্মেন্টেশন? কচি বাঁশের টুকরোকে মাটির পাত্রে বা কলাপাতায় মুড়ে বেশ কিছুদিন রেখে দেওয়া হয়। এই সময়ে প্রাকৃতিকভাবেই সেখানে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটিরিয়া সহ নানা ধরনের বন্ধু ব্যাকটিরিয়া বা ‘প্রোবায়োটিক’-এর জন্ম হয়। সাধারণভাবে ব্যাকটিরিয়া শুনলেই রোগবালাইয়ের কথা মনে পড়ে, কিন্তু এই বাঁশের শাঁসে থাকা ব্যাকটিরিয়াগুলো শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। চিকিৎসকদের মতে এই উপকারী ব্যাকটিরিয়াগুলো আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হজমশক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এই প্রোবায়োটিক ব্যাকটিরিয়াগুলো ঢাল হিসেবে কাজ করে। ফার্মেন্টেশনের ফলে বাঁশের শাঁসে থাকা খনিজ ও ভিটামিন শরীরের সহজেই গ্রহণ করতে সুবিধা হয়। এছাড়াও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও এদের ভূমিকা রয়েছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কৃত্রিম ক্যাপসুল বা সাপ্লিমেন্টের কথা বলছে, তখন অরুণাচলের মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বনের বাঁশকে ফার্মেন্টেড করে সেই প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করছেন। বাঁশের শাসের এই গুণাগুণ তো অরুণাচলের প্রবীণরা শিখে এসেছেন বাপঠাকুরদার কাছ থেকে। এবার সেই বন্ধু ব্যাকটিরিয়া খোঁজার কাজ হবে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। অধ্যাপক বিবেকানন্দ মণ্ডল বলছিলেন, ‘আমাদের গবেষণার বিষয়বস্তু হল বাঁশের মধ্যে ফার্মেন্টেশনের ফলে সৃষ্ট সেই ব্যাকটিরিয়াগুলি আবিষ্কার করে তার গ্লোবালাইজেশন করা। আর তারপর বাঁশ থেকে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাদ্য সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া।’ সেই খোঁজে সফল হলে স্থানীয়ভাবে বাঁশের পুষ্টিকর খাদ্য বানানোর ছোট ছোট ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করাও তাঁদের লক্ষ্য। আর অধ্যাপক সন্দীপকুমার দাসের দাবি, ‘প্রোবায়োটিকের মাধ্যমে খাদ্যের গুণাগুণ বৃদ্ধি করা কতটা সম্ভব, সেটাও আমাদের গবেষণার বিষয়।’
পোড়া বাঁশের শাঁসের সঙ্গে কাঁচা লংকা ও আদাবাটা মিশিয়ে বানানো চুওকা বা ফাঁপা বাঁশের চোঙার ভেতর মাংস ঢুকিয়ে, তারপর তাতে বাঁশের শাঁস এবং ভেষজ মশলা ভরে তা আগুনে পুড়িয়ে রান্না করা পদ কিন্তু কেবল পুষ্টিগুণে নয়, স্বাদেও লা-জবাব। যদি গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো চুওকা, বাঁশপোড়া মাংস বা পিকা পিলার স্বাদ মালদা বা শিলিগুড়িতে বসে উপভোগ করতে পারবেন আপনিও।
