গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য শক্তিশালী ও সজাগ বিরোধীপক্ষের উপস্থিতিতে। বিরোধীশূন্য করে দিলে আখেড়ে একনায়কত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম হয়। যা সুস্থ গণতন্ত্র নয়। গত এক যুগ ধরে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস নিঃসন্দেহে অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। একের পর এক রাজ্যে নির্বাচনি ভরাডুবি, নরেন্দ্র মোদির মতো জনপ্রিয় নেতার সামনে মুখ থুবড়ে পড়া এবং দলের ভেতরের অন্তহীন কোন্দল হাত শিবিরকে কোণঠাসা করে দিয়েছে।
উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম ভারতের সিংহভাগ রাজ্যে বিজেপির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে কংগ্রেস। এই আবহে দক্ষিণ ভারতে কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক হাওয়া। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক জয়যাত্রা, কর্ণাটকে ক্ষমতার মসৃণ হস্তান্তর শুধু দলের পুনরুজ্জীবন ঘটাচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠছে।
কর্ণাটকে সম্প্রতি সিদ্দারামাইয়াকে সরিয়ে ডিকে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানোর সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র ক্ষমতার হাতবদল নয়। এটা কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের হাইকম্যান্ড সংস্কৃতির একটি ব্যতিক্রমী এবং পরিণত পদক্ষেপ। শিবকুমার কর্ণাটকে কংগ্রেসের এমন এক বিশ্বস্ত সেনাপতি, যিনি দুর্নীতির অভিযোগে জেল খাটার পরেও বহু প্রলোভন ও চাপের মুখে নতিস্বীকার করেননি, নিজের দলের পিঠে ছুরি মারেননি। শুধু মুখ বুজে দলের ওপরমহলের নির্দেশ পালন করে এসেছেন।
তাঁর এই প্রশ্নাতীত আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে শেষপর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন তিনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কেরলে কিংবা কর্ণাটকে সমস্ত গোষ্ঠীকে এক ছাতার তলায় এনে ভিডি সতীশন এবং ডিকে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রিত্বে বসানো কংগ্রেসে নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন ঘটনা।
দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার পর কেরলে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। তামিলনাডুতে পুরোনো জোটসঙ্গী ডিএমকে-কে ছেড়ে অভিনেতা-রাজনীতিক থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে-কে সমর্থন করে ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের স্থান পাকা করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর সরকারকে কুর্সিচ্যুত করা কংগ্রেসের পরবর্তী নিশানা। সেখানে হাত শিবিরের তুরুপের তাস ওয়াইএস শর্মিলা রেড্ডি।
কংগ্রেসের এই দাক্ষিণাত্য বিজয় বিজেপিকে যেমন চিন্তায় ফেলেছে, তেমনই ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কংগ্রেসের এই উত্থান শুধু বিজেপিকে নয়, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে ‘ইন্ডিয়া’র বাকি শরিকদের। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের পর যে আঞ্চলিক নেতারা কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বিরোধী জোটের রাশ নিজেদের হাতে নিতে চাইছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এমকে স্ট্যালিন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল কিংবা তেজস্বী যাদবরা নিজেদের দুর্গে হেরে গিয়েছেন। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁদের আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা এখন স্তিমিত।
মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরে ও শারদ পাওয়ারের মতো ঝানু রাজনীতিকরাও অস্তিত্ব সংকটে। অখিলেশ যাদব ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হতেই পারেন, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে এগোনো আঞ্চলিক দলগুলির পক্ষে কঠিন। রাহুল দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, বিজেপির সঙ্গে লড়াই আসলে দুটি ভিন্ন মতাদর্শের লড়াই। একদিকে আরএসএস-বিজেপির উগ্র জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ব ও মেরুকরণের রাজনীতি, অন্যদিকে কংগ্রেস ও সহযোগী দলগুলির বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষতা।
অতীতে আঞ্চলিক দলগুলি এই তত্ত্বকে আড়ালে উপহাস করলেও, বর্তমান বাস্তবতায় কংগ্রেসের ওই অবস্থানকে মান্যতা দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। কেবল বুথ স্তরের সংগঠনকে চাঙ্গা করে এবং স্পষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে যে লড়াই জেতা যায়, তা দক্ষিণ ভারত প্রমাণ করে দিয়েছে। রাজনীতিতে রাতারাতি কোনও অলৌকিক পরিবর্তন হয় না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল লড়াইয়ের মানসিকতা ধরে রাখা।
ক্ষমতার মোহে অন্ধ না হয়ে, লড়াইয়ে অবিচল থেকে দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেসের ঘর গোছানো ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
The put up অন্য লড়াই appeared first on Uttarbanga Sambad.
