জগা ঢাকি
- শংকর সাহা
আজ বসন্তপল্লি যেন কারও কাছে অজানা নেই। এই পল্লি এখন ঢাকিপাড়া নামে পরিচিত। এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির পুরুষ ঢাকে বোল তুলতে জানেন। তবে পুজো ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় তাঁদের ইটভাটায় কাজ করে সংসার চালাতে হয়। বসন্তপল্লির পূর্বপাড়ায় জগার বাড়ি। ঢাকি হিসেবে তার বেশ নামডাক। এবার দুর্গাপুজোয় শহরের মজুমদারবাড়িতে তাকে বায়না করেছেন কর্তামশাই। পঞ্চমী থেকে দেবীর বিদায় পর্যন্ত সেখানেই পুজো কেটে যায়। সঙ্গে পলতাকে নিয়ে যায় জগা। পলতা কাঁসর বাজায়।
সেদিন উঠোনে বসে জগা ঢাকটিকে একবার বাজিয়ে দেখছে, এমন সময়ে হারু বাবার দিকে চেয়ে বলে, ‘বাবা, তুমি এবারও কি পুজোয় থাকবে না? সবাই বাবার সঙ্গে ঠাকুর দেখে। আমারও তো ইচ্ছে হয় বাবা।’
হারুর কথাগুলো যেন জগাকে তিরের মতো বিদ্ধ করে। জগা জানে পুজোর দিনগুলোর জন্য সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে। হাতে একটু টাকা আসে। অভাবের সংসারে সেই টাকাটুকুর মূল্য অনেক।
-জানিস হারু, মজুমদারবাড়ির সবাই আমার ঢাক বাজানো পছন্দ করে। আমি না গেলে ওরা কষ্ট পাবে। তুই কি চাস ওরা কষ্ট পাক?
-না বাবা, তুমি যাবে। তবে আসার সময়ে আমার জন্যে শহর থেকে একটা খেলনা গাড়ি কিনে আনবে?
ছেলের মাথায় আদরের স্পর্শে জগা বলে, ‘আনব বাবা!’
-বাবা, ওরা তোমায় অনেক কিছু খেতে দেয় তাই না? আমার কথা মনে পড়ে না তখন তোমার?
জগা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ছেলেকে কেবল বুকে টেনে নেয়। হারুর কথার উত্তর জগার কাছে ছিল না। পৃথিবীতে এমনই অনেক প্রশ্নের উত্তর এমন অসমাপ্তই থেকে যায়…
ভালোবাসার এক নাম
- রমা ঘোষ
এবার পুজোটা একটু দেরিতে। টানা কিছুদিনের হাঁসফাঁস গরমের পর বৃষ্টি। গাছে গাছে শিউলির সুবাস আর সেইসঙ্গে বাড়ি থেকে দূরের প্রিয়জনেদের জন্যে মনকেমন করা। শরতের এমনই এক সকালে ঘুমভাঙার পর কাবেরী মনে মনে কল্পনা করে, তার অনেক দিনের সাধ পুজোয় তসরের মধ্যে আড়ির কাজ করা হলুদ শাড়ি কিনবে। দাম প্রায় দশ হাজার। তবে এ সাধ্য তার এখন আছে। কথাটা ভেবে কাবেরীর মনে বেশ আনন্দ হল। কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে মন খারাপও আছে। দিন দুয়েক আগে তার মামির ফোন এসেছিল। তিনি খুবই অসুস্থ। অপুষ্টিতে শরীর দুর্বল। তিনি ফোনে কাবেরীকে বলেছিলেন, যদি চিকিৎসা ও কিছুদিনের জন্যে ভালো খাবারদাবারের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। মামির ছেলেমেয়ে কেউ প্রতিষ্ঠিত নয়। সবার ঘরে অভাব।
কাবেরীর মনে পড়ে মামির অবস্থা কোনওদিনই খুব ভালো না থাকলেও মোটামুটি চলার মতো যখন ছিল, তখন শৈশবে তাদের বাড়ি ঘুরতে গেলে ওরা মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাত, কাবেরীর জন্যে বাঁশের মাচায় রাখা ধানের গোলার পাশে সামান্য লেপকাঁথা দিয়ে সযত্নে বিছানা করে দিত। বাজারের শেষ লগ্নে গিয়ে একটু কম দামে মাছ কিনে এনে মামি রান্না করত। সবাই তখন বলত যে কাবেরীর ভাগ্যে তাদের মাছ খাওয়া হচ্ছে।
এখন অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গিয়ে বিবাহিত জীবনের নানা উত্থানপতন, টানাপোড়েনের পর কাবেরীর চুলেও পাক ধরেছে, মামির সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয় না বহুদিন। এত বছর পর মামির এই ফোনের আর্তনাদে কাবেরীর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, মনের মধ্যে শিহরন হয়। কাবেরী নিজের মনকে প্রশ্ন করে, এই অনুভূতির নাম কী। উত্তর পায় না। কাবেরী এবারের বহু কাঙ্ক্ষিত শাড়ি কেনাটা বাদ দেয়। মনকে অনেকটা ভালো করার চেয়ে মনের খারাপ লাগাগুলো দূর করা বেশি জরুরি বলে মনে হয় তার।
The publish অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.
