সিদ্ধিলাভের আশায় হত নরবলি, বাংলার প্রাচীন এই দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রহস্যময় কাহিনি

ইন্ডিয়া খবর/INDIA
Spread the love


দিনের বেলাতেও ঘন অন্ধকারে ডুবে থাকত জঙ্গল। চারদিকে বাঘ-ভালুকের আতঙ্ক। তার মধ্যেই জঙ্গলের গভীরে বসত কাপালিকদের আসর। মন্ত্রোচ্চারণের মাঝে চলত সাধনা, আর সিদ্ধিলাভের আশায় নাকি দেওয়া হত নরবলি। সেই ভয়ংকর অতীতের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন শ্যামরূপা মন্দির।

দুর্গাপুরের কাঁকসার গড় জঙ্গল। একসময় এই জঙ্গলে পা রাখতেই ভয় পেতেন সাধারণ মানুষ। ঘন জঙ্গলের মাঝে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছত না মাটিতে। তার উপর বাঘ, ভালুক-সহ নানা হিংস্র জীবজন্তুর অবাধ বিচরণ। সন্ধ্যা নামার পর তো জঙ্গলের দিকে তাকাতেও সাহস করতেন না অনেকে।আর সেই অন্ধকার জঙ্গলের বুকেই শুরু হয়েছিল শ্যামরূপার আরাধনা। কথিত আছে, সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের আরাধ্যদেবী ছিলেন শ্যামরূপা। তাঁর আমলেই গড় জঙ্গলের গভীরে মন্দিরে দেবীর পুজো শুরু হয়।লোকশ্রুতি বলে, দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেই এই মন্দির চত্বরের পরিবেশ বদলে যেত। রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের বুকে বাড়ত কাপালিকদের আনাগোনা। চলত তন্ত্রসাধনা। আর সিদ্ধিলাভের আশায় নরবলির মতো ভয়ংকর প্রথাও ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। 

আরও পড়ুন:

Shyamrupa-Mandir
দেবী শ্যামরূপা। নিজস্ব চিত্র

কথিত আছে, এক রাতে এক কাপালিক নরবলি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় সেখানে হাজির হন ভক্ত কবি জয়দেব গোস্বামী। নরবলি বন্ধ করার জন্য কাপালিককে বোঝান তিনি। জয়দেব জানান, নরবলি বন্ধ করলে তিনি শ্যামা মাকে শ্যামরূপে দর্শন করাবেন। এরপর ভক্তিভরে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন জয়দেব। তাঁর প্রার্থনায় সাড়া দেন দেবী। কাপালিক শ্যামা মায়ের মধ্যে শ্যামরূপের দর্শন পান। সেই দৃশ্য দেখে নিজের ভুল বুঝতে পারেন তিনি এবং জয়দেবের চরণে লুটিয়ে পড়েন। তারপর থেকেই নাকি বন্ধ হয়ে যায় নরবলি। শুরু হয় ছাগবলি। সেই প্রাচীন ঘটনার স্মৃতি আজও মিশে রয়েছে শ্যামরূপা মন্দিরের পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে।

Shyamrupa-Mandir-2
শ্যামরূপা মন্দির। নিজস্ব চিত্র

তবে এখানেই শেষ নয়। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে আরও একাধিক রহস্যময় জনশ্রুতি। কথিত আছে, অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে গড় জঙ্গলের কোনও এক অজানা স্থান থেকে ভেসে আসে তোপধ্বনির মতো শব্দ। আর সেই শব্দের পরেই শুরু হয় বলির প্রথা। মন্দির চত্বরে রয়েছে একটি বহু পুরনো গাছ। ভক্তদের বিশ্বাস, মনের ইচ্ছা নিয়ে সেই গাছে ইটের টুকরো বেঁধে দিলে পূরণ হয় মনোস্কামনা। সেই বিশ্বাসে বছরের পর বছর ধরে গাছটির ডালে বাঁধা হয়েছে হাজার হাজার ইটের টুকরো। আজ আর সেই জঙ্গলে আগের মতো হিংস্র জীবজন্তুর তাণ্ডব নেই।

কিন্তু দুর্গাপুজোর চারদিন গড় জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে নামে মানুষের ঢল। মন্দির চত্বরে বসে মেলা, দূরদূরান্ত থেকে আসেন হাজার হাজার ভক্ত। হয় নরনারায়ণ সেবা। পুজোর সময় দশ হাজারেরও বেশি মানুষের সমাগম হয় বলে জানান মন্দিরের সেবাইতরা। মন্দিরের প্রধান প্রবীণ সেবাইত ভূতনাথ রায় বলেন, “আমরাও যখন প্রথম মন্দিরে আসতাম তখন হিংস্র জীবজন্তুদের দেখা যেত। কখনও কখনও তাদের সঙ্গে লড়াই করে মন্দিরে যেতে হতো। সেন বংশের পরে আমরাই প্রথম মন্দিরের দায়িত্ব নিই। মায়ের সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তাঁদের উন্নতি হয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় দশ হাজারের বেশি মানুষের সমাগম হয়। নরনারায়ণ সেবাও হয়।”

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *