দীপ সাহা
সাদা শাড়ি। হাওয়াই চটি। টালির চালের ঘর।
আপাতদৃষ্টিতে এই শব্দবন্ধগুলোর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে সততা, দারিদ্র্য, মাটির কাছাকাছি থাকা এবং আরও অনেক কিছু। রাজনীতিতে ভাবমূর্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মনে একটি ছবি তৈরি করতে পারলে অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ভাবমূর্তির আড়ালে বাস্তবটা ঠিক কী, প্রশ্নটা সেখানেই।
ছোটবেলায় ভাবসম্প্রসারণে পড়েছিলাম, ‘অন্যায় যে করে, অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’ তখন হয়তো কথাটার গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের মনে জমতে থাকা ঘৃণার একটা সীমা আছে। সেই ঘৃণাই একসময় ভোটের বাক্সে গিয়ে কথা বলে। বাংলার মানুষ তার প্রমাণ একবার নয়, বারবার দিয়েছে।
আমি ’৭৭ দেখিনি। কিন্তু দেখেছি বাম আমলের শেষ দিকটা। দেখেছি চায়ের দোকানে, পানের ঠেকে, বাসে-ট্রেনে, বাজারে একটাই আলোচনা- পরিবর্তন চাই। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল কেন? দুর্নীতি, তোলাবাজি, সন্ত্রাস, দাদাগিরি আর হঠকারিতার বিরুদ্ধে। একটু ভালো থাকার আশায়। একটু স্বস্তির আশায়। ক্ষমতার সামনে মাথা না নোয়ানোর আশায়।
তারপর এল ২০১১। পরিবর্তন হল। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো রাজনীতি একটু অন্যরকম হবে। কিন্তু বছর ঘুরতে ঘুরতে সেই পরিবর্তনের শরীরেও পুরোনো রাজনীতির অসুখ বাসা বাঁধল। কাটমানি, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি, দাদাগিরি শব্দগুলো ক্রমশ সাধারণ মানুষের অভিধানের অংশ হয়ে উঠল।
কাট টু ২০২৬। মে মাস। পনেরো বছরের ব্যবধানে মানুষ সেই একই পরিবর্তন চাইল। কীসের জন্য? সেই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, নির্লজ্জ আরও একটা সরকারকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না বলে। শ্মশানের কাঠ থেকে শুরু করে আবাসের ঘর, সব সওব… জায়গায় কাটমানি চাই তৃণমূল নেতাদের। ভাতা পেতে পয়সা, ভাতা ঢুকলে পয়সা। চাকরি পেতে পয়সা। খালি পয়সা আর পয়সা।
ঠিক সেই জায়গাতেই বিজেপির প্রবেশ। ভোটের আগে দিল্লির এক বিজেপি নেতার কথা বারবার কানে বাজত- ‘হাম কর লেঙ্গে। জ্যায়সে ভি হো, বঙ্গাল চাহিয়ে।’ তাঁরা করে নিয়েছেন। সত্যিই করে নিয়েছেন। কিন্তু কী করে?
মোদি থেকে শা- সকলের আশ্বাস ছিল, এরাজ্যে কাটমানির আর কোনও গল্প থাকবে না। সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। জুলুমবাজি চলবে না। ভয় নয়, ভরসা। ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগানটি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আর নতুন আশ্বাস, সব মিলিয়ে মানুষ বিজেপিকে সুযোগ দিল।
তারপর?
একটা বারুইপুর। একটা এনকাউন্টার। রেলস্টেশন ও ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদ। অভয়ার মামলা ঠান্ডাঘরে চলে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তার সঙ্গে সেই পুরোনো রোগের নতুন সংস্করণ- তোলাবাজি।
যাহা ছিল বাম, তাহাই হইয়াছিল তৃণমূল; এখন তাহাই আবার বিজেপি। এক বাক্যে যদি গোটা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে হয়, এর চেয়ে নির্মম ব্যাখ্যা আর হয়তো নেই।
ঘরের কাছে এনজেপি দেখুন। ফুলবাড়ি দেখুন। সেবক রোড দেখুন। অভিযোগ উঠছে, কোথাও ঠিকাদারদের সঙ্গে ‘কমিশন’ নিয়ে দরকষাকষি, কোথাও বার-পাবে গিয়ে ধমক, কোথাও গাড়ি-ট্রাক থেকে তোলা, কোথাও আবার বালি-পাথরের সিন্ডিকেট দখলের চেষ্টা। শিলিগুড়ি থেকে সরশুনা, কাটোয়া থেকে কলকাতা- বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এমন অভিযোগ ভেসে আসছে। রোজ।
নতুন সরকার। বয়স মাত্র তিন মাস। অথচ আখের গোছানোর তাড়া যেন বহু বছরের।
এখানেই প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বদলালেই কি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়? দল বদলালেই কি তোলাবাজির চরিত্র বদলে যায়?
উত্তরটা যদি ‘না’ হয়, তবে মানুষ এত ভোট দিয়ে কী পেল?
কয়েকদিন আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘যে অনাকাঙ্ক্ষিত ডিম থেরাপি শুরু হয়েছে, সেই ডিম কিন্তু ঘুরে অন্যদিকেও পড়তে পারে।’ তিনি সতর্ক করেছিলেন দলীয় কর্মীদেরও। নতুন করে বিজেপিতে আসা ‘সনাতনী’দেরও সাবধান করেছিলেন। ডেডলাইন ছিল ১৫ দিনের।
সেই ডেডলাইনের কয়েকদিন ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, তার মধ্যে কী ব্যবস্থা হল?
তোলাবাজির বিরুদ্ধে কোনও গ্রেপ্তার? কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি? কোনও সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ?
না। অন্তত সাধারণ মানুষের চোখে এখনও তেমন কিছু ধরা পড়ছে না। দলগতভাবে কয়েকজনকে শোকজ করা হয়েছে মাত্র। তারমধ্যে মাত্র ১০ শতাংশের মতো নেতাকে সাসপেন্ড। ব্যাস ওইটুকুই। দু-চারজন চুনোপুঁটিকে পুলিশ দিয়ে তুলে বড় বিজেপি নেতাদের বাঁচাতে চাইছে দলেরই একাংশ।
ফলত মানুষের কথাবার্তায় অস্বস্তির সুর শোনা যাচ্ছে।
গতকাল একটি অনুষ্ঠানবাড়িতে খাওয়াদাওয়ার পর বসে ছিলাম। পাচকের দুই সহকারী মহিলা ফুরসত পেয়ে গল্প করছিলেন। একজন আরেকজনকে বললেন, ‘পদ্মফুলত ভোটখান দিয়া ভুল করসু মুই। … অন্নপূর্ণা ভান্ডারত নামখান কাটি দিল।’
কয়েকদিন আগে টোটোয় এক সহযাত্রীর মুখে আরও সরল আক্ষেপ, ‘আমাদের জন্য দিদিই ঠিক ছিল। চুরি করুক, যাই করুক, যা কথা দিত, তাই রাখত।’
ট্রেনে, বাসে, আড্ডায় এমন কথাবার্তা কানে আসছে। এগুলো কোনও রাজনৈতিক দলের প্রেস বিবৃতি নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের মন বদলের প্রাথমিক লক্ষণ।
একবার ভাবুন, শমীকবাবু।
বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মানুষের বিতৃষ্ণা তৈরি হতে লেগেছিল ৩৪ বছর। তৃণমূলের ক্ষেত্রে লেগেছিল ১৫ বছর। আর আপনাদের ক্ষেত্রে যদি সেই বিতৃষ্ণার বীজ মাত্র তিন মাসেই অঙ্কুরিত হয়ে যায়, তবে বিষয়টি কি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবার নয়?
কারণ মানুষের ধৈর্য কমছে। প্রত্যাশা বাড়ছে। মানুষ এখন আর পাঁচ বছর অপেক্ষা করে ভুল শোধরানোর সুযোগ দিতে রাজি নয়। তারা দেখতে চায়, সরকার কথা রাখছে কি না। এখনই।
মানুষ চাইছে, এই সরকার অন্তত আগের ক্ষতগুলিতে মলম দিক। তোলাবাজি বন্ধ করুক। সিন্ডিকেট ভাঙুক। দলের নাম ব্যবহার করে যারা মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।
এইটুকু আশা কি তাঁরা করতে পারেন না?
আসলে দোষ স্বীকার করার মধ্যে একটা মহৎ ব্যাপার আছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে দোষ কবুল করলে শাস্তি কিছুটা লঘু হতে পারে। রাজনীতিতেও খানিক তাই। শমীকবাবু অন্তত সমস্যাটাকে দেখতে পাচ্ছেন, এই ধারণাটা মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে। সেটাই হয়তো জনরোষ কিছুটা প্রশমিত করার প্রথম ধাপ।
কিন্তু শুধু স্বীকার করলেই তো হবে না। দোষ দেখেছেন। এবার ব্যবস্থা নিন। এক মাস নয়। দু’মাস নয়। এক বছর নয়। পাঁচ বছর নয়। এখনই। কারণ মানুষ অপেক্ষা করছে ফলাফলের জন্য, সতর্কবাণীর জন্য নয়। মানুষ দেখতে চাইছে, ‘জিরো টলারেন্স’ কথাটা পোস্টারে থাকবে, নাকি বাস্তবেও তার প্রয়োগ হবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, বিজেপিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা সত্যিই আলাদা।
সিপিএমের জায়গায় তৃণমূল, তৃণমূলের জায়গায় বিজেপি, শুধু ক্ষমতার পালাবদল হলে গণতন্ত্রের কোনও লাভ নেই। পতাকা বদলালে মানুষের জীবন বদলায় না। বদলাতে হয় প্রশাসনের চরিত্র। বদলাতে হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বদলাতে হয় ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
আর যদি তা না হয়? তাহলে মনে রাখতে হবে, বিকল্প কখনও শূন্য থাকে না। ‘বিকল্প নেই’ এই ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। মানুষ যখন কোনও বিকল্প পায় না, তখন সে বিকল্প তৈরি করে নেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই। গণতন্ত্রও সেটাই বুঝিয়ে এসেছে বারবার।
সুতরাং ডেডলাইন দিয়ে লাভ নেই। দরকার অবিলম্বে ব্যবস্থা। দরকার এমন কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ, যাতে দলের আর কোনও নেতা বা কর্মী মানুষের কাছে কাটমানি চাইতে যাওয়ার আগে দশবার ভাবেন। দরকার এমন প্রশাসনিক বার্তা, যাতে তোলাবাজ বুঝতে পারে ক্ষমতার ছত্রছায়া বলে আর কিছু নেই। তবেই মানুষ বিশ্বাস করবে, এই সরকার আগের সরকারের পুনরাবৃত্তি নয়।
ডিমের অভিমুখ বদলাতে সত্যিই বেশি সময় লাগে না। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসের অভিমুখ একবার বদলে গেলে, তাকে ফিরিয়ে আনা বড়ই কঠিন।

