দীপু মনি, ইমরান ও প্রতিহিংসার রাজনীতি

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(বাংলাদেশ-পাকিস্তানের রাজনীতিতে বন্দিত্ব এক ভয়ংকর অস্ত্র। প্রচুর বিরোধী নেতা জেলে। তবু তাঁরা দল পালটান না।)

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

পুলিশের গাড়ি থেকে নামছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন পররাষ্ট্র ও শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। চুল সব সাদা হয়ে গিয়েছে। পা দুটো চলে না। শরীর ক্লান্ত। চোখের দৃষ্টি শূন্য। মুখ অভিব্যক্তিহীন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শববাহী যানের কাছে। সেখানে তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথচলার সঙ্গী, আইনজীবী স্বামী চিরনিদ্রায়।

সেই চরম শোকের মুহূর্তেও স্বস্তি নেই। চারপাশে ঘিরে ধরেছে ডজন ডজন ক্যামেরা। এক বন্দি নারীর ব্যক্তিগত শোককে যেন প্রকাশ্য তামাশা বানিয়ে ফেলা হল। মাস কয়েক আগে কাগজে ছবি দেখেছিলাম, দীপু মনির গুরুতর অসুস্থ স্বামী হুইলচেয়ারে বসে জেলবন্দি স্ত্রীকে দেখতে যাচ্ছেন।

দৃশ্যটি দেখে যে কোনও সুস্থ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। এই অপমান কি সত্যিই প্রাপ্য ছিল? অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কি রাষ্ট্র মানুষের ন্যূনতম আত্মসম্মান কেড়ে নিতে পারে?

একই দৃশ্য দেখা যায় সীমান্তের অন্য পারেও। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে যখন বন্দি অবস্থায় দেখা যায়, তখন ভেতরটা একইভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে।

যে মানুষটি দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, যাঁর নামে ক্রিকেট বিশ্ব উত্তাল হত, তিনি আজ জেলের অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন। গুরুতর অসুস্থ। তাঁর ক্রিকেট জীবনে প্রতিদ্বন্দ্বী জাভেদ মিয়াঁদাদ পর্যন্ত বন্দি ইমরানের কথা বলতে গিয়ে হাউহাউ করে কাঁদছেন। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিকারহীন।

ইমরানের দল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নেতাদের তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন। অথচ পাক প্রধানমন্ত্রীর নিজের দাদা বন্দি ছিলেন দীর্ঘদিন। জানেন, কী দুঃসহ এ জীবন।

সদ্য স্বামীহারা দীপু মনির কথা ভাবুন। বারোদিন আগে তিনি আন্তর্জাতিক ট্রাইবিউনালকে বলেছেন, ‘আমি দু’বছর কারারুদ্ধ। এপ্রিলে আমার জামিন আবেদন করা হয়েছে। এখন আমি জামিন চাই না। জামিন আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই।’

কেন চান না? তাঁর উত্তরে লুকিয়ে রয়েছে যাবতীয় যন্ত্রণা, ‘আগে জামিন আবেদন শুনানির সময় ট্রাইবিউনাল বলেছিল, বাসায় গিয়ে কী করবেন? এখন আমার সত্যিই আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। আমার স্বামী তৌফিক নেওয়াজ সাত বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর বাকশক্তিও ছিল না। কোনও কথা বললে চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন তিনি।’ একটু থেমে সংযোজন ছিল, ‘আমি পাঁচ বছর সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় শয্যাশায়ী স্বামীর যত্ন নিয়েছি। এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে তাঁকে দু’বছর অজ্ঞাতস্থানে থাকতে হয়েছে। আশ্রিত অবস্থায় ছিলেন। আমিও যত্ন নিতে পারিনি। এ জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি।’

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার মাস আগে তাঁর স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দীপু মনির সাফ কথা, ‘তখন স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য জামিন আবেদন করেছিলাম। ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে কাছে থাকতে পারিনি। এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমি আর কার কাছে যাব? সন্তানরা জামিন চায়। আমার বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই।’

বাসায় যাওয়ার আর তাড়া নেই, এই স্বীকারোক্তি কী ভয়ংকর মর্মান্তিক। যখন এ কথা বলছেন জেলবন্দি প্রাক্তন পররাষ্ট্র, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী। বয়স ৬১ যাঁর।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আজ বন্দিত্ব এক ভয়ংকর অস্ত্র। বিশেষত বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। ক্ষমতা বদলালেই শুরু হয় বিরোধী বিনাশ পালা। সবাইকে নিমেষে চোর আর দুর্নীতিবাজ তকমা দিয়ে সোজা গারদে। বাংলাদেশের তারেক রহমান ও পাকিস্তানের শেহবাজ শরিফরা পশ্চিমবঙ্গের শাসকদের থিওরি এখনও জানেন না। নইলে সব বিরোধীকে নিজেদের দলে নিয়ে আসতে পারতেন। দীপু মনিদের কৃতিত্ব, তাঁরা বাংলার ‘নয়া মিরজাফর’ কাকলি-ববি হাকিম-অরূপ-মদনদের মতো নিজের বহুদিনের নেত্রীকে সেকেন্ডের মধ্যে ছেড়ে নাটক করেননি জেলে যাওয়ার ভয়ে। দীপু বলতেই পারতেন, হাসিনা আপা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, আমি কেন জেলে যাব? আমি ক্ষমতায় আসা বিএনপিতেই নাম লেখাব!

পদ্মাপারের দীপু মনিরা গঙ্গাপারের লজ্জাহীন কাকলি-অরূপ-ববিদের বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন, কাকে বলে আদর্শ। কাকে বলে কৃতজ্ঞতাবোধ। এপারে ক্ষমতাচ্যুতদের শুধু ডিমের কুসুমে মাখামাখি হওয়ার ভয় ছিল, ওপারে তো খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তবু দীপু মনিরা কাকলিদের মতো অক্লেশে কলঙ্কিত হতে চাননি।

কাকলি, ফিরহাদ, অরূপরা বরং আদর্শ করেছেন ইমরান খানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীকে। জেল থেকে বেরিয়েই পার্টি থেকে বেরিয়ে ফাওয়াদ রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে নেন। এখন দিব্যি আছেন। শাসকরা তাঁকে আর ঘাঁটায় না।

ওদিকে বাংলাদেশে শুধু দীপু মনি নন। সালমান এফ রহমান বা আনিসুল হকের মতো বহু প্রবীণ আওয়ামী নেতা বন্দি। প্রাক্তন মন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেন তো দিনাজপুর জেলেই মারা গিয়েছেন ইউনূসের আমলের শেষদিকে। বদলা নেওয়ার এই সংস্কৃতি কখনও শেষ হয় না।

এভাবে বিরোধী দলের গোটা নেতৃত্বকে একসঙ্গে জেলে ভরে রাখা, এটা কতটা বাস্তবসম্মত? রাষ্ট্রের কাছে কি অন্য কোনও বিকল্প নেই? অবশ্যই আছে। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে অভিযুক্ত নেতাদের গৃহবন্দি রাখার নিয়ম। নজরদারিতে রেখে বিচার চালানো যায়।

গৃহবন্দি রাখলেও তো পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। তাতে পরিবারের পাশে থাকা যায়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মেলে। মানুষের মানবিক মর্যাদা বজায় থাকে।

কিন্তু বর্তমান শাসকরা সেই পথে হাঁটেন না। তাঁদের উদ্দেশ্য বিচার নয়। তাঁদের মূল লক্ষ্য হল চরম অপমান করা। জেলখানার নিষ্ঠুর পরিবেশ দিয়ে বিরোধীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে বিরোধীদের অপরাধী সাজিয়ে রাখা।

আরও বিস্ময়ের, দু’দেশের সংবাদমাধ্যমে বন্দি নেতাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিস্থিতি নেই। ঢাকা বা লাহোরের কোনও কাগজ বা টিভিতেই এই বন্দি নেতাদের নিয়ে বিস্তৃত খবর মেলে না। কেমন আছেন তাঁরা। আরও খারাপ ব্যাপার, সংবাদমাধ্যমের এই নিয়ে বিস্তৃত লেখার ইচ্ছেও নেই, ক্ষমতাও নেই। বাংলাদেশের কাগজেও দেখি, দীপু মনিদের নিয়ে খবর বেরোয় তাঁরা কোনওদিন কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে। নইলে মিডিয়া খুব নিষ্ক্রিয়ই থাকে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ জমানায় বিরোধী দল বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাদের ঠিক এইভাবেই হেনস্তা হতে হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় মিথ্যা আর রাজনৈতিক মামলায় আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁর চিকিৎসার দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁর দলের হাজার নেতা-কর্মীকে মাসের পর মাস জেলে পচানো হয়েছে।

পাকিস্তানেও ইতিহাস একই। জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়েছিল সামরিক শাসক। নওয়াজ শরিফকে দুর্নীতিবাজ সাজিয়ে বারবার জেলে পাঠানো হয়েছে। বেনজির ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলি জারদারি জীবনের বহু মূল্যবান বছর কাটিয়েছেন জেলে।

আর আজ ক্ষমতাসীনেরা সেনার মদতে ইমরান খানের পিটিআইকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাইছে। শাহ মেহমুদ কুরেশির মতো পিটিআইয়ের আরও অনেক শীর্ষ নেতা-নেত্রী এখন বন্দি। যেমন ওমর আইয়ুব খান, শিবলি ফারাজ। তাঁদের অনেককে দশ বছরের দীর্ঘ জেলের সাজাও শোনানো হয়েছে।

মায়ানমারের দিকে তাকালে ছবিটা আরও ভয়ংকর। সেখানে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করেছে সেনা। আং সান সু কি-র মতো নেত্রী দিনের পর দিন বন্দি। কখনও জেলে, কখনও গৃহবন্দি। তাঁর দলের হাজার হাজার কর্মীকে জেলে পোরা হয়েছে। বিচারের নামে চলছে স্রেফ প্রহসন। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার রাজনীতিও এই প্রতিশোধের চক্র থেকে মুক্ত নয়।

দুর্নীতির অভিযোগ কি শুধুই বিরোধীদের বিরুদ্ধে থাকে সর্বত্র? যাঁরা আজ ক্ষমতায় বসে গদি গরম করছেন, তাঁদের গায়ে কি এক ফোঁটাও দুর্নীতির দাগ নেই? ইতিহাস বলে, গদিতে বসলে সবাই সাধু বনে যান। আর গদি হারালেই হয়ে যান দাগি আসামি। প্রশাসন যুক্তি দেয়, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে।

এটা সর্বৈব মিথ্যা। আইন যদি নিজস্ব গতিতেই চলবে, তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে এত বছর লাগে কেন? কেন দিনের পর দিন জামিন আটকে রাখা হয়? কেন বিচারের আগেই বছরের পর বছর জেলের ভাত খেতে হয়?

আসল সত্যিটা হল, আইনকে শাসনযন্ত্রের চাবুক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

জেলে ভরে বিরোধীদের ঠেকিয়ে রাখার এই নীতি শান্তি আনে না কখনও। এটা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চেহারা ভয়ংকর। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যাঁরা দীপু মনি বা ইমরানদের নরকযন্ত্রণা দিয়ে উল্লাস করছেন, কাল তাঁদের জন্যও কারাগারের লৌহকপাট খুলে যেতে পারে।

Give search engine marketing, search engine marketing title, slug, meta description, key phrase, key phrases, tags in English for this information for higher attain



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *