তারেকের ঢাকায় এর্দোগানের ছায়া 

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(বাংলাদেশের তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও মতাদর্শগত আঁতাত কি নিছকই অস্ত্র বেচাকেনার চুক্তি, নাকি ভারতের পূর্ব সীমান্তে এক বিপজ্জনক প্রভাব বলয় তৈরির গোপন ছক?)

ধৃতিমান সরকার

আন্তর্জাতিক কূটনীতির দাবা খেলায় চালগুলো সব সময় প্রকাশ্যে দেওয়া হয় না। অনেক সময় আসল চালটা চালা হয় লোকচক্ষুর আড়ালে, একেবারে নিঃশব্দে। গত কয়েক বছরে ভারতের পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পটপরিবর্তন হয়েছে, তার দিকে দিল্লির কড়া নজর ছিল শুরু থেকেই। তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, ঢাকার ওপর হয়তো বেজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়বে। কিন্তু কূটনীতির অঙ্ক সব সময় সোজা পথে হাঁটে না। বেজিং নয়, বর্তমানে সাউথ ব্লকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সুদূর আঙ্কারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এর্দোগানের নতুন ইসলামি সাম্রাজ্যবাদের ছায়া যে এত দ্রুত বঙ্গোপসাগরের তীরে এসে পড়বে, তা হয়তো সাউথ ব্লকও পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি।

তারেক রহমান বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করার পরপরই অত্যন্ত নিঃশব্দে ঢাকা ঘুরে গিয়েছেন এর্দোগানের পুত্র বিলাল এর্দোগান। তাঁর সঙ্গী ছিলেন তুরস্কের হয়ে খেলা বিশ্বখ্যাত ফুটবলার মেসুত ওজিল। সাধারণ চোখে এটি একটি সৌজন্যমূলক সফর বলে মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরটি ছিল ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যে এক নতুন এবং সুগভীর রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বোঝাপড়ার অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রথম পদক্ষেপ। বিলালের এই সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান তিনদিনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে ঢাকা পৌঁছান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পরই বাংলাদেশ ও তুরস্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি নিয়ে একটি যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি বা ‘২+২ মেকানিজম’ গঠন করবে। প্রতি বছর দুই দেশের বিদেশ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা এই কৌশলগত বোঝাপড়া নিয়ে নিয়মিত আলোচনায় বসবেন। ভারতের প্রতিবেশী কোনও দেশের সঙ্গে তুরস্কের এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত ও সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া দিল্লির কাছে নিঃসন্দেহে এক প্রবল অশনিসংকেত।

কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে—বাংলাদেশ তো চিনের কাছ থেকেও প্রচুর অস্ত্র কেনে। সাবমেরিন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান—ঢাকার সামরিক ভাণ্ডারের একটা বড় অংশই বেজিংয়ের দেওয়া। তাহলে তুরস্কের এই নয়া প্রবেশ নিয়ে ভারতের এত মাথাব্যথা কেন?

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চিন মূলত পরিকাঠামো নির্মাণ এবং বিপুল অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভারত খুব ভালো করেই জানে কীভাবে বেজিংয়ের এই ‘চেক-বুক ডিপ্লোম্যাসি’ বা আর্থিক কূটনীতির মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু তুরস্কের উদ্দেশ্য নিছক অস্ত্র বেচে মুনাফা লোটায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রেসিডেন্ট এর্দোগানের আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরেই বৃহত্তর ইসলামি দুনিয়ার স্বঘোষিত নেতা হওয়ার দৌড়ে রয়েছে। আর সেই লক্ষ্য পূরণে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এবং তাদের রাজনৈতিক শরিকদের সঙ্গে আঙ্কারার এক সুকৌশলী বোঝাপড়া গড়ে উঠছে।

সোজা কথায়, তুরস্ক কেবল সমরাস্ত্রের ডিলার হিসেবে ঢাকায় পা রাখছে না। এর্দোগানের প্রভাব বলয় বিস্তারের স্বপ্নের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের এক অদ্ভুত সাযুজ্য তৈরি হয়েছে। আর দুই দেশের এই ভূরাজনৈতিক ও মতাদর্শগত মেলবন্ধন ভারতের অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক সুগভীর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় তুরস্ক এখন এক প্রধান শরিক হয়ে উঠেছে। আঙ্কারা থেকে ঢাকা এখন শুধু গতানুগতিক অস্ত্র কিনছে না, তারা সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের পথে হাঁটছে। তুরস্কের উন্নত ‘আনকা’ এবং ‘বায়রাখতার টিবি২’ ড্রোন থেকে শুরু করে টি-১২৯ ‘আটাক’ কমব্যাট হেলিকপ্টার কেনার জন্য ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যে চূড়ান্ত স্তরের আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি তুরস্কের সর্বাধুনিক ‘সিপের’ দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তিও প্রায় পাকা করে ফেলেছে ঢাকা। শুধু তা-ই নয়, এই সামরিক যান ও অত্যাধুনিক ড্রোনগুলো বাংলাদেশেই যৌথভাবে তৈরি করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। তুরস্কের এই ‘কোপ্রোডাকশন’ মডেল প্রমাণ করে যে, আঙ্কারা ঢাকাকে কেবল একটি খরিদ্দার দেশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও সামরিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। যখন কোনও দেশ অপর কোনও দেশের সঙ্গে মিলে এমন আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি করে, তখন আগামী কয়েক দশকের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ, আপগ্রেড এবং প্রশিক্ষণের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, যা চাইলেই রাতারাতি ছিন্ন করা যায় না।

ভারতের দুশ্চিন্তার সবচেয়ে বড় কারণ হল এই অস্ত্রগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রয়োগক্ষমতা। ভারতের পূর্ব সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর অত্যন্ত কাছাকাছি তুরস্কের তৈরি এই ঘাতক ড্রোন বা আনকা সিস্টেমের উপস্থিতি ভারতের সামরিক অঙ্ককে মারাত্মকভাবে জটিল করে তুলেছে। শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর মতো ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক এলাকার কাছে যদি এমন আধুনিক ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন থাকে, তবে তা যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য এক বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও ঢাকা দাবি করে যে এই ড্রোনগুলো কেবল রুটিন নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হয়, তবুও দিল্লির সাউথ ব্লক বিষয়টিকে মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না।

এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান-তুরস্ক-বাংলাদেশ এক নয়া অক্ষ তৈরির জল্পনা। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এর্দোগান বারবার প্রকাশ্যে পাকিস্তানের হয়ে সুর চড়িয়েছেন এবং ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করেছেন। এখন সেই একই তুরস্ক যদি ভারতের পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে, তবে ভারতের দুই দিকেই এক চরম বৈরী শক্তির বলয় তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তুরস্কের বিভিন্ন এনজিও ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নানা অংশে বিপুল অর্থ ঢালছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিষ্কারভাবে মনে করছে, এই আর্থিক সাহায্যের আড়ালে তথাকথিত ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ বা বৃহত্তর বাংলাদেশ তৈরির মতো বিপজ্জনক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী জিগিরকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। এই কাল্পনিক ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এর মানচিত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশকে দেখানো হয়, যা সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।

কূটনীতির ভাষায় তুরস্ক তাদের এই নতুন আগ্রাসী নীতিকে বলছে ‘এশিয়া অ্যা-নিউ’ বা নতুন করে এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের কৌশল। আর এই সুদূরপ্রসারী কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী ঢাকাকে। তুরস্ক খুব ভালো করেই জানে, ভারতের মতো একটি বিশাল সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে ভারতের পূর্ব প্রান্তে এক অদৃশ্য অথচ তীক্ষ্ণ চাপ তৈরির খেলা শুরু করেছে।

তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার কথা মুখে বললেও, তুরস্কের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান মাখামাখি প্রমাণ করে যে ঢাকা আসলে পর্দার আড়ালে এক নতুন ভূরাজনৈতিক জোটের দিকে ঝুঁকছে। এই জোট শুধু কিছু যুদ্ধাস্ত্রের নয়, এটি এক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত জোট। ভারতের সাউথ ব্লককে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। শুধুমাত্র পুরোনো প্রথাগত কূটনীতি দিয়ে তুরস্কের এই আগ্রাসী ও বহুমুখী চাল আটকানো সম্ভব নয়। সীমান্ত নজরদারি বাড়ানো, নিজেদের সামরিক পরিকাঠামো আরও উন্নত করা এবং পূর্ব সীমান্তের এই নতুন সমীকরণ রুখতে শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী কৌশল গড়ে তোলা এখন ভারতের জন্য শুধু সময়ের অপেক্ষা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আকাশ থেকে ধেয়ে আসা ড্রোনের মোকাবিলা হয়তো আধুনিক রাডার বা মিসাইল দিয়ে করা সম্ভব, কিন্তু ভূরাজনৈতিক আঁতাতের যে অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হচ্ছে, তা ভাঙতে সাউথ ব্লককে কূটনীতির নতুন অস্ত্র শানাতেই হবে।

(লেখক সাংবাদিক, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বিশারদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *