ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসায় কেমোথেরাপির ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোগীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। কেমোর ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতিকর ক্যানসার কোষের পাশাপাশি স্বাভাবিক ও সুস্থ কোষগুলোকেও নির্বিচারে ধ্বংস করে। এরফলে রোগীর চুল পড়ে যাওয়া, তীব্র ক্লান্তি, রক্তাল্পতা, বমিভাব এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়। এই চিরাচরিত সমস্যার সমাধানে এবার দিশা দেখালেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। তাঁরা তৈরি করেছেন এক বিশেষ ‘স্মার্ট ড্রাগ’, যা সুস্থ কোষে কোনও আঘাত না করে শুধুমাত্র ক্যানসার আক্রান্ত কোষকে বেছে নিয়ে ধ্বংস করে দেবে।
গুয়াহাটির ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএএসএসটি)-র বিজ্ঞানী ডঃ আশিস বালা এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি গুয়াহাটি (আইআইটি গুয়াহাটি)-র রসায়ন বিভাগের ডঃ কে পি ভবকের যৌথ গবেষণায় এই সাফল্য এসেছে। এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা জার্নাল অফ মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি’তে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের তৈরি এই অভিনব ড্রাগ অণুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আরকে-২৫১’ (RK-251)।
কীভাবে কাজ করে এই স্মার্ট ড্রাগ?
গবেষকদের তৈরি এই ওষুধটি শরীরে কাজ করে কার্যত ‘ট্রোজান হর্স’-এর মতো। ড্রাগটি সাধারণ অবস্থায় শরীরে একেবারেই নিষ্ক্রিয় বা সুপ্ত থাকে। ক্যানসার কোষের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সেখানে‘রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিজ বা আরওএস-এর মাত্রা সুস্থ কোষের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। ওষুধটি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সময় যখনই ক্যানসার কোষের সংস্পর্শে আসে, তখন সেই উচ্চমাত্রার আরওএস অণুটির ভেতরে থাকা একটি বিশেষ রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেয়।
এর ফলে সেখান থেকে মুক্ত হয় ‘এনবিডিএইচইএক্স’ নামের একটি অত্যন্ত কার্যকর ক্যানসার-বিরোধী যৌগ। এই যৌগটি সরাসরি ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, শরীরের সুস্থ কোষে আরওএস-এর মাত্রা স্বাভাবিক থাকায় সেখানে ওষুধটি সক্রিয় হতে পারে না। ফলে সুস্থ কোষের কোনও ক্ষতি হয় না।
গবেষণাগারে কার্যকারিতা ও প্রাণীদেহে পরীক্ষা
প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ক্যানসারের অন্যতম জটিল ও বিপজ্জনক রূপ ‘ট্রিপল নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার’ (টিএনবিসি)-এর ক্ষেত্রে এই ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর। গবেষণাগারে এই ধরনের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রুখতে সফল হয়েছে আরকে-২৫১।
শুধু তাই নয়, জীবদেহে এই নতুন ওষুধের বিষক্রিয়া ও সহনশীলতা পরীক্ষা করার জন্য জেব্রাফিশ মডেলের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষণায় স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, ড্রাগ প্রয়োগের পর মাছগুলির স্বাভাবিক বৃদ্ধি বা কোষের কার্যকলাপে কোনও রকম বিষাক্ত প্রভাব পড়েনি বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
চিকিৎসাক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় টার্গেটেড ড্রাগ ডেলিভারি বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধের প্রয়োগ দীর্ঘদিনের এক লক্ষ্য। আরকে-২৫১ সেই পথেই এক বড় অগ্রগতি। আগামী দিনে বিভিন্ন ধাপে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলে, কেমোথেরাপির দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বহুলাংশে কমিয়ে ক্যানসার চিকিৎসাকে অনেক বেশি রোগীবান্ধব ও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব হবে।

