এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘অন্নপূর্ণা’ যোজনা। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তারা অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা পাবেন। ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হতে সাধারণ মানুষের উল্লাসের জায়গা নিয়েছে সংশয় ও বিড়ম্বনা। সৌজন্যে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ১৩ পাতার দীর্ঘ ও জটিল আবেদনপত্র।
এই ফর্মটি ঘিরে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, তা অতীতে কোনও সরকারি সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে হয়নি। তৃণমূল জমানায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আওতায় মহিলারা কোনও শর্তের বেড়াজাল ছাড়া আর্থিক সাহায্য পেতেন। অন্নপূর্ণা যোজনায় সম্পূর্ণ বিপরীত প্রশাসনিক তৎপরতা দেখাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
ওই প্রকল্পে আবেদন করার জন্য ১৩ পাতার ফর্মে উপভোক্তার নাম-ঠিকানা, জন্ম তারিখের মতো সাধারণ তথ্যের পাশাপাশি র্যাশন কার্ডের প্রকৃতি, পরিবারের প্রতি সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভোটার কার্ডের পার্ট ও এপিক নম্বর চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর জীবনযাত্রার মান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফর্মে লিখতে বলা হয়েছে। যেমন তাঁর বসতবাড়ি পাকা কি না, তাতে ৩টি বা তার বেশি পাকা ঘর আছে কি না, চার চাকা গাড়ি বা পারিবারিক জমির মালিকানা রয়েছে কি না, কিংবা পরিবারের কেউ আয়কর বা পেশাগত কর দেন কি না।
এমনকি পরিবারের শিশুদের টিকাকরণ এবং তারা সরকারি না বেসরকারি- কোন ধরনের স্কুলে পড়ে, সে তথ্যও চাওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে অনুদান পাওয়ার জন্য নাগরিকদের কেন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত ঠিকুজি-কুষ্ঠি সরকারের দরবারে পেশ করতে হবে, তা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ব্যাপক বেনোজল আছে। বহু পুরুষ বাড়ির মহিলাদের নাম করে ভাতা হাতিয়েছেন- এমন উদাহরণ সামনে এনেছেন তিনি। তাঁর কথায়, প্রাথমিকভাবে অন্তত ৩০ লক্ষ নাম বাদ যাবে এই প্রকল্পে। আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারের মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা পাওয়ার নজিরও রয়েছে। কারও কারও আবার একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ওই ভাতা পাওয়ার অভিযোগও আছে।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ডিবিটি লিংকের প্রক্রিয়া মেনে চলার নির্দেশ দিয়ে সেই পথ বন্ধে উদ্যোগী হয়েছে। এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। সরকারের দাবি, ১৩ পাতার ফর্মে বিস্তারিত তথ্য জানার উদ্দেশ্য হল সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করা। শুধুমাত্র সমাজের প্রান্তিক এবং প্রকৃত দুঃস্থদের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া মূল লক্ষ্য।
ভারতের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে মানুষের হাতে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছালে তা বাজারকে সচল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার কঠিন শর্তাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, নতুন সরকার যথেচ্ছ খয়রাতি বিলি থেকে কিছুটা সরে আসতে চাইছে। মহারাষ্ট্রের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যে লড়কি বহিন যোজনা চালাতে গিয়ে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন দিতে হিমসিম খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়তো বাংলার প্রশাসনকে আয় বুঝে কৃচ্ছ্রসাধনের রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য করছে।
তবে অন্নপূর্ণা যোজনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটি হল নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নাবলি। ফর্মে জানতে চাওয়া হয়েছে, আবেদনকারী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে আবেদন করেছেন কি না কিংবা এসআইআর-এ নাম বাদ পড়েছে কি না। বাদ পড়লে তিনি ট্রাইবিউনালে আবেদন করেছেন কি না। এতে সরকার ঘুরপথে রাজ্যে এনআরসি করতে চাইছে বলে প্রশ্ন উঠছে।
সামান্য ৩,০০০ টাকার সরকারি অনুদান নিতে গিয়ে নাগরিকত্ব নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এতে অন্নপূর্ণা যোজনা আর পাঁচটা সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের মতো কেবল আর্থিক সহায়তার মাধ্যম হয়ে থাকছে না। এটা একদিকে প্রকৃত অভাবীদের শনাক্ত করার প্রশাসনিক ছাঁকনি বটে, অন্যদিকে নাগরিকদের পরিচয় যাচাই করার অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হতে চলেছে। এই মাত্রাতিরিক্ত জটিলতায় প্রকৃত উপভোক্তারা বঞ্চিত হলে, সেই দায় সরকারেরই।
The put up অন্নপূর্ণায় বিড়ম্বনা appeared first on Uttarbanga Sambad.
