সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: ৪৮ দলের বিশ্বকাপের (World Cup 2026) কাঠামো নিয়ে ফুটবল-পণ্ডিতরা যতই কাটাছেঁড়া করুন না কেন, এর অন্তর্নিহিত এক অদ্ভুত বৈষম্যকে কোনওভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। নকআউটের প্রথম পর্বে কোনও গ্রুপের রানার্স মুখোমুখি হবে অন্য গ্রুপের রানার্সের। আবার কাউকে নিয়তির ফেরে লড়তে হবে সোজা কোনও গ্রুপ চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে। জাপান দুর্ভাগ্যবশত পড়েছে এই দ্বিতীয় এবং কঠিনতম চক্রব্যূহে। রাউন্ড অফ ৩২-এর এই মহাযুদ্ধে নীল সামুরাইদের (Samurai Blue) সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সফলতম দেশ, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। (Brazil Vs Japan) কিন্তু অঙ্কের হিসেব আর মাঠের বাস্তবতা যে সবসময় সরলরেখায় চলে না, তা মায়ামির সৈকতে দাঁড়িয়েও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, নামটা ব্রাজিল হলেও, জাপানের মতো গোছানো এবং সুশৃঙ্খল দলের মুখোমুখি হতে যে কার্লো আন্সেলোত্তির (Carlo Ancelotti) ছেলেরাও ভেতরে ভেতরে বেশ অস্বস্তিতে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফুটবলের এই জাদুকরি মঞ্চে জাপান এখন শুধু একটি দেশ নয়, তারা এক নিখুঁত শিল্পের নাম। ইতালীয় মগজাস্ত্রে শানিত আন্সেলোত্তি যেখানে এখনও দলের সঠিক ভারসাম্য খুঁজতে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন, সেখানে জাপান যেন এক স্থির, অবিচল লক্ষ্যভেদী তির। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে ব্রাজিলের দুর্বলতাগুলি নগ্ন হয়ে গিয়েছিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়ারদের মতো বিশ্বমানের প্রতিভা থাকলেও আন্সেলোত্তির সাম্বা-তরণী যে এখনও নিশ্ছিদ্র নয়, তা প্রমাণিত। অন্যদিকে, জাপান খুব ভালো করেই জানে তাদের শক্তির আসল জায়গা কোনটা। সবুজ গালিচায় তাদের ৩-৪-৩ ছক যেন নিপুণ শিল্পীর নিখুঁত তুলির টান। দলের ইনসাইড স্ট্রাইকাররা এমন এক জাদুকরি দক্ষতায় উইং ব্যাকদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেন যে, তঁারা বিপক্ষের রক্ষণে ঢুকে অনায়াসে বিষাক্ত শট নিতে পারেন। শুধু তাই নয়, স্ট্রাইকার নীচে নেমে এলে তাঁর পেছন দিয়ে যে ক্ষিপ্রতায় তারা আক্রমণে ওঠে, তা যে কোনও রক্ষণভাগকে দুমড়েমুচড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মাঝমাঠের একচ্ছত্র দখল আর দুর্ভেদ্য রক্ষণ জাপানের এমন এক ইস্পাতকঠিন প্রাচীর তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিপক্ষ সুযোগ পায় অতি সামান্যই।
এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের মঞ্চ হিসেবে টেক্সাসের হিউস্টনকে পাওয়াটা জাপানের জন্য এক অপ্রত্যাশিত আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডালাসে দুইটি ম্যাচ খেলার সুবাদে টেক্সাসের পরিবেশের সঙ্গে নীল সামুরাইরা এখন দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। জাপানি সমর্থকরাও যেন টেক্সাসের প্রেমে মজেছেন। গ্যালারির বাইরে মেক্সিকান সমর্থকদের সঙ্গে জাপানিদের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান আর বন্ধুত্বের ছবিগুলি ইতিমধ্যেই এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ফ্রেমে পরিণত হয়েছে। হিউস্টনের স্টেডিয়ামে তাই জাপানের পক্ষে যে এক গগনভেদী গর্জন উঠবে এবং তা যে ব্রাজিলের স্নায়ুর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে, তা এখন থেকেই অনায়াসে বলে দেওয়া যায়।
ব্রাজিল আর জাপান- দুই দলই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী অনায়াসে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার দাবিদার। কিন্তু টুর্নামেন্টের বিন্যাস আর ভাগ্য তাদের আগেই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সত্যি বলতে, নকআউটের এই পর্যায়ে এসে কোনও দলই ব্রাজিলের মতো পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হতে চায় না। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠটাও ঠিক ততটাই নির্মমভাবে সত্য। আন্সেলোত্তির দলও জানে, এই রাউন্ড অফ ৩২-এর মঞ্চে জাপানের মতো নিখুঁত, অদম্য এক ফুটবল মেশিনের সামনে পড়াটা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। হিউস্টনে তাই সাম্বা আর সামুরাইয়ের এই মহারণ শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই ফুটবলের দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের এক ধ্রুপদী মহাকাব্য হতে চলেছে।

