একটি শিশুর জন্মের অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় প্রকৃতির সবচেয়ে জটিল নির্মাণকাজ। মায়ের গর্ভে তখন প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ স্নায়ুকোষ। গড়ে উঠছে মানুষের মস্তিষ্ক। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে থাকে এক ভিন্ন জগতের চাবিকাঠি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’ বা এএসডি। এটি কোনও রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের এক বিশেষ ধরনের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য। জিনের খেলা নাকি পরিবেশের প্রভাব, অটিজমের উৎস খোঁজার চেষ্টা আধুনিক বিজ্ঞানের। লিখছেন ড. মোঃ সাহিদুল আরেফিন (অডিওলজিস্ট ও স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট)।
বহু বছর ধরে এই অটিজমের জন্য সমাজ কখনও মায়েদের অবহেলাকে দায়ী করেছে, কখনও আবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে জীবনদায়ী টিকাকে। কিন্তু বিগত পাঁচ দশকের নিরলস গবেষণা আজ সব কুসংস্কারের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান স্পষ্ট জানাচ্ছে, অটিজম কোনও একক কারণে হয় না। এর পিছনে রয়েছে বহুমাত্রিক জৈবিক খেলা।
আরও পড়ুন:

বিজ্ঞানীদের মতে, অটিজমের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হল জিনগত বৈশিষ্ট্য। যমজ সন্তান এবং পারিবারিক ইতিহাসের ওপর করা একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ভিন্নতার পিছনে জিনের অবদান প্রায় ৭৫ থেকে ৯২ শতাংশ। তবে শরীরে কোনও একটি নির্দিষ্ট ‘অটিজম জিন’ নেই। বরং শত শত জিনের জটিল বিন্যাস একসঙ্গে মস্তিষ্কের গঠনকে প্রভাবিত করে। চিকিৎসকেরা একে বলেন ‘পলিজেনিক নিউরোডেভেলপমেন্টাল কন্ডিশন’।
অবশ্য জিনই শেষ কথা নয়। জিনের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গর্ভকালীন পরিবেশ। যেমন, গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে মৃগী রোগের ওষুধ ‘ভ্যালপ্রোইক অ্যাসিড’ ব্যবহার করলে ভ্রূণের স্নায়ু বিকাশে ঝুঁকি বাড়ে। আবার প্রথম তিন মাসে মায়ের শরীরে কোনও গুরুতর সংক্রমণ বা প্রদাহ হলে, তার প্রভাব পড়তে পারে শিশুর মস্তিষ্কে। এমনকী গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে অতিরিক্ত বায়ুদূষণ বা পিএম ২.৫ কণার সংস্পর্শও এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে রয়েছে বাবার বয়স কিংবা মায়ের ডায়াবেটিসের মতো বিষয়গুলিও।
চিকিৎসা শাস্ত্রে অটিজমকে ঘিরে কম বিতর্কের জন্ম হয়নি। ১৯৪৩ সালে ডক্টর লিও ক্যানার প্রথম অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর মায়েদের দোষারোপ করে তৈরি হয় অবৈজ্ঞানিক ‘রেফ্রিজারেটর মাদার থিওরি’। ১৯৯৮ সালে এমএমআর টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক নিয়ে ভুয়ো দাবিও উঠেছিল। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহ সমস্ত শীর্ষ স্তরের গবেষকেরা আজ একমত—টিকার সঙ্গে অটিজমের কোনও সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কিছু মেনে নেয় না, আর প্রমাণের ভিত্তিতেই বিজ্ঞান নিজের ভুল সংশোধন করেছে।

আসল সত্য লুকিয়ে আছে জিন, পরিবেশ এবং এপিজেনেটিক্সের পারস্পরিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে। জিন যদি মস্তিষ্কের প্রাথমিক নকশা তৈরি করে, তবে পরিবেশ সেই নকশাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রতিটি অটিস্টিক শিশুর অনুভূতি, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা হয়। দোষারোপ বা ভয় নয়, সঠিক সময়ে এই বৈচিত্র্যকে চিনে নেওয়াই আসল কাজ। সহমর্মিতা আর গ্রহণযোগ্যতাই পারে প্রতিটি শিশুর নিজস্ব সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
