ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা যখন বিপন্নতার নাম

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা যখন বিপন্নতার নাম

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


ফুটবলে মেসি-ভিনিসিয়াসরা থাকলেও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে স্বস্তিতে নেই ফুটবলের দুই মহাশক্তি।

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

যে শহরে তাঁদের দেশের ফুটবল ম্যাচ, সেই শহরটি একদিন আগে থেকে তাঁদের দখলে চলে যায় রাতারাতি। বিমানবন্দর থেকে রেলস্টেশন, সব জায়গাতেই তো তাঁদের পতাকা। এইখানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মানুষ একাকার।

যে রাশিয়া হোক, বা সে আমেরিকা। সে জাপান হোক, বা দক্ষিণ আফ্রিকা বা জার্মানি। সব বিশ্বকাপের দেশে ভিড়ের মধ্যে নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তাঁদের নাচানাচি দেখে মনে হয়, ওঁরা কি সুখেই না আছেন নিজের দেশে!

মনে তো হয় না।

সাংবাদিক বা কৃষক, শিক্ষক বা সরকারি কর্মী, যাঁরা এসেছেন আমেরিকায়, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, কোনও দেশই ভালো জায়গায় নেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে। দুটো দেশের নেতারাই আশায়, ফুটবল বিশ্বকাপ জিতলে সব যন্ত্রণা চাপা পড়ে যাবে।

পৃথিবীর সব দেশের নেতারাই বোধহয় একই অঙ্ক করে ফেলেছেন এতদিনে। আমাদের ভারত সরকার যেমন। যে খেলা এখন মানুষের ধর্মে পরিণত, সেই ক্রিকেটটাকে বিজেপির শাখা করে ফেলার কাজ অনেকটাই সারা।

আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টরা অত বোকা নন। অন্তত কিছু চক্ষুলজ্জা রয়েছে তাঁদের। তাই সেটা এখনও হয়নি। জাতীয় দলের সঙ্গে অন্তত নাম জড়ায়নি তাঁদের পার্টির।

দুটো দেশ আমেরিকায় যে প্রান্তেই খেলতে যাচ্ছে, সেখানে মানুষের সমুদ্র। আম আমেরিকানরা হতভম্ব। ফুটবল দেখতে এত কষ্ট করে অন্য প্রান্তে যায় মানুষ? দেখতে দেখতে ভাবি একটা কথা। বিমানের ভাড়া এত, হোটেলের ভাড়া এত— কী করে এঁরা যাতায়াত করছেন সর্বত্র। অবশ্যই কষ্ট করে থাকছেন অনেকে। তবু যাতায়াতের খরচ তো কম নয়! গ্যালারির সেই উন্মাদনা শেষ হলে লাতিন আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশী কোন বাস্তবতায় চোখ খোলে? মাঠের বাইরের খেলায় কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

ব্রাজিলের অর্থনীতিকে বলা চলে মাঠের সেই দক্ষ স্ট্রাইকারের মতো, যে মাঝেমধ্যে চমৎকার ড্রিবলিং করে গোল দিয়ে দেয়। কিন্তু রক্ষণভাগ নড়বড়ে হওয়ায় ম্যাচ জেতা কঠিন হয়ে পড়ে। লুলা দা সিলভার বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেকারত্ব কিছুটা কমেছে, আমজনতার হাতে কিছুটা টাকা এসেছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। দেশের জিডিপি বৃদ্ধির গতি বড্ড মন্থর। বড় বড় কৃষিপণ্য রপ্তানি করে দেশটা কোনওমতে টিকে ঠিকই, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মানোন্নয়ন থমকে।

ব্রাজিলের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা থেকে। রিও ডি জেনেইরো বা সাও পাওলোর বস্তি, মানে ফাবেলাগুলোতে আইনের সমান্তরালে চলে অপরাধীচক্রের নিজস্ব শাসন। ড্রাগ লর্ড আর স্থানীয় মাফিয়াদের দাপটে সাধারণ মানুষ তটস্থ। এ তো আমরা ২০১৪ বিশ্বকাপে গিয়েই দেখেছি। পুলিশি অভিযান হয়, রক্তক্ষয় হয়, কিন্তু পরিস্থিতির স্থায়ী বদল হয় না। সরকার লড়ছে, কিন্তু মাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে রাখতে পারছে না।

নির্বাচন এ বছরই। রাজনীতিতে লুলা বনাম বলসোনারোপন্থীদের কাদা ছোড়াছুড়ি চলছেই। একপক্ষ একটু বামে বাঁক নিতে চাইলে অন্যপক্ষ ডানে টানছে।

ফুটবল যদি হয় শিল্পের খোঁজ, ব্রাজিলের সমাজ এখন সেই শিল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক চরম মেরুকরণের গল্প। মানুষের মনে ক্ষোভ, কারণ দেশে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সুফল শুধু এক শ্রেণির মানুষের পকেটেই। আমাজন অববাহিকার পরিবেশ রক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কথা হলেও দেশের ভেতরের মাফিয়াতন্ত্র সেই অরণ্য ধ্বংসের খেলায় মেতে। লুলা বারবার এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা বললেও কাজে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

আর্জেন্টিনার গল্পটা আবার একেবারেই আলাদা। তারা এখন খেলছে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ পেনাল্টি শুটআউট। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় এসে দেশের অর্থনীতিতে যে ‘শক থেরাপি’ বা বড়সড়ো ওলটপালট শুরু করেছিলেন, এখন তার ফল মিলছে অদ্ভুতভাবে। যে দেশে মুদ্রাস্ফীতি একসময় আকাশ ছুঁয়েছিল, সেখানে এখন সরকারি খাতায় বাজেট উদ্বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের আয়ব্যয়ের চেয়ে বেশি।

আর্জেন্টিনার সাংবাদিকরা বলছেন, এই আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট পুরোপুরি ফাঁকা। মিলেইর কঠোর সংস্কারের জেরে হুহু করে বেড়েছে দারিদ্র্য, কমেছে মানুষের প্রকৃত মজুরি। তিনি এই সময়টাকে কাঠামোগত সংস্কারের বছর বলছেন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ক্ষমতা ছাঁটা হচ্ছে, কাজের সময় নিয়ে নতুন নিয়ম হচ্ছে। সরকারি ভরতুকি রাতারাতি তুলে নেওয়ার ফলে গ্যাস, বিদ্যুৎ আর গণপরিবহণের ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে।

আর্জেন্টিনার মানুষ এখন এমন এক রেফারি পেয়েছে, যে ফাউল দেখলেই লাল কার্ড দেখাচ্ছে, কিন্তু সেই লাল কার্ডে গ্যালারির দর্শক কতটা খুশি, তা বলা মুশকিল। বুয়েনস আয়ার্সের রাস্তায় এখন মাঝেমধ্যেই ক্ষোভের আগুন। পেনশনের টাকা বাড়ানোর দাবিতে বয়স্ক মানুষেরা যখন লাঠি হাতে রাস্তায় নামছেন, তখন পুলিশের লাঠি তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছে। সমাজটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছে। একদল ভাবছে এই কষ্ট সাময়িক, এরপর সুদিন আসবে। অন্যদল দেখছে শুধু অন্ধকার।

দুই দেশের সামাজিক বিন্যাস তুলনা করলে দেখব, সমস্যাগুলো আলাদা হলেও যন্ত্রণার গভীরতা একইরকম। ব্রাজিলে অপরাধ আর বৈষম্য সমাজকে কুরে-কুরে খাচ্ছে। সেখানে গায়ের চামড়ার রঙের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় অনেক সময়। ফুটবল টিমে ভিনিসিয়াস যতই মহাতারকা হোন, কালো বা মিশ্র বর্ণের মানুষেরা সেখানে অনেক ক্ষেত্রে আজও ব্রাত্য। ওদিকে আর্জেন্টিনায় মধ্যবিত্ত সমাজটাই এখন বিলুপ্তির পথে। যে দেশ লাতিন আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত আর সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য গর্ব করত, সেই দেশ এখন শুধু স্রেফ টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। হাসপাতালের লাইনে ওষুধ মিলছে না, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার টাকা বন্ধ।

আর্জেন্টিনার তরুণ প্রজন্ম তাই এখন দলে দলে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। তাঁদের চোখে আর মারাদোনা বা মেসির দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও স্বপ্ন নেই। তাঁরা শুধু চান একটা ইউরোপীয় পাসপোর্ট আর দেশ ছাড়ার টিকিট। ব্রাজিলের যুবসমাজ অবশ্য দেশ ছাড়ার চেয়েও বেশি লড়ছে বেঁচে থাকার জন্য। রিও-র ফাবেলা বা বস্তিগুলোতে ফুটবলটাই একমাত্র মুক্তির পথ, কিন্তু সেই পথ দিয়ে ক’জন আর তারকা হতে পারে?

রাজনীতির ময়দানেও দুই প্রতিবেশী এখন দুই ভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে। ব্রাজিলে লুলার বামপন্থী জোট কোনওমতে জোড়াতালি দিয়ে শাসন চালাচ্ছে। সংসদে তাঁর দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে প্রতিটি আইন পাশ করাতে তাঁকে দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে। তিনি চাইলেও পুরোপুরি নিজের নীতি প্রয়োগ করতে পারছেন না। আর্জেন্টিনায় মিলেই একাই একশো। তিনি সংসদকে তোয়াক্কা না করে একের পর এক জরুরি ডিক্রি জারি করে দেশ চালাচ্ছেন। তাঁর এই স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা আর্জেন্টিনার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিচার বিভাগের সঙ্গেও তাঁর সংঘাত এখন চরমে।

ব্রাজিলের সাংবাদিকদের কাছে শুনলাম, দুই দেশেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। ব্রাজিলের মানুষ ক্লান্ত পুরোনো দুর্নীতির গল্প শুনতে শুনতে, আর আর্জেন্টিনার মানুষ আতঙ্কিত আগামীকালের নতুন সরকারি ঘোষণার কথা ভেবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রাজিল তাও কিছুটা স্থিতিশীল, কারণ তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আমিরশাহি বা চিনের মতো দেশের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আর্জেন্টিনা অনেকটা আইএমএফের ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ঋণের শর্ত মানতে গিয়েই মিলেইকে সাধারণ মানুষের ওপর এই অত্যাচারের চাবুক চালাতে হচ্ছে। ব্রাজিলের মুদ্রা ‘রিয়েল’ কিছুটা শক্তি দেখালেও আর্জেন্টিনার ‘পেসো’র অবস্থা শোচনীয়। ডলারের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে দেশের মানুষের সঞ্চয় স্রেফ কর্পূরের মতো উড়ে গিয়েছে। ফলে মাঠের ফুটবলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা যতই নান্দনিক হোক, বাস্তব জীবনের পিচে দুই দেশই এখন ফাউল এড়াতে আর গোল লাইন বাঁচাতে ব্যস্ত।

লাতিন আমেরিকার এই দুই শক্তি যখন বিশ্বমঞ্চে ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠে, তখন মনে হয় সব দুঃখ বুঝি ভুলে গিয়েছে তারা। ভারতের মতো বহু দেশের মানুষ তাঁদের দিকে তাকিয়ে আনন্দ-দুঃখের মালা পরে। তবে স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাওয়ার পর, যখন মাঝরাতে এক সাধারণ আর্জেন্টিনীয় বা ব্রাজিলীয় ঘরে ফেরেন, তখন তাঁকে হিসাব করতে হয় কালকের রুটি বা জলের দাম কত হবে। ফুটবল সেখানে স্রেফ একটা খেলা নয়, একটা আফিম। যা কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলিয়ে রাখে, তাঁদের দেশটা আসলে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। হায়, বিশ্বকাপ নিয়ে ফিরলেও পালটাবে না ছবিটা!

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *