পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: কুলকুল শব্দে বয়ে চলা মূর্তি নদী, চারদিকে চা বাগানের বিস্তীর্ণ সবুজ গালিচা, আর তার মাঝেই মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। কখনও আবার হঠাৎ নেমে আসে বৃষ্টি। পরিষ্কার আকাশে দূরে উঁকি দেয় ভুটান ও কালিম্পং পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য। ডুয়ার্সের মেটেলির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখলে যে কেউ মোহিত হতে বাধ্য। ইয়ংটং চা বাগানের (Yongtong Tea Backyard) ভেতরের এই পাহাড়ি এলাকার নাম বৈজুখেত (Baijukhet)। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা একে ভালোবেসে ডাকেন ‘ভ্যালি অফ ডুয়ার্স’ নামে (Valley of Dooars)। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই বৈজুখেতকেই এবার রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে নতুন পালক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন ইয়ংটংয়ের বাসিন্দারা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যা পারেননি, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় তাঁরা বুক বাঁধছেন। জলপাইগুড়ি নেচার অ্যান্ড ট্রেকার্স ক্লাবের কোঅর্ডিনেটর ভাস্কর দাস বলেন, ‘দু’বছর আগে এখানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বৈজুখেতে নেচার স্টাডি ক্যাম্প করতে এসেছিলাম। এখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রসারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্থানীয়রা উদ্যোগী হলেও প্রয়োজন সঠিক সরকারি পরিকল্পনার।’
আগে সামসিং চা বাগানের একটি ডিভিশন ছিল ইয়ংটং। এখন এটি নিজেই একটি পৃথক চা বাগান। এই বাগানের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে বৈজুখেতের অপার সৌন্দর্য। কী আছে সেখানে? স্থানীয় বাসিন্দা নীলম প্রধানের কথায়, ‘এখানকার বিশালাকার কালো গ্রানাইটের বোল্ডারগুলোতে বসে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার মজাই আলাদা। সেখান থেকে কাঁচা রাস্তা ধরে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় মূর্তি নদীর পাড়ে। এখানকার ক্ষণস্থায়ী রোদ-বৃষ্টির খেলা পর্যটকদের এক অন্যরকম অনুভূতি দেয়।’ আরেক বাসিন্দা সুন্দর প্রধান জানান, বৃষ্টি থামার পর আকাশ পরিষ্কার হলে এখানকার সৌন্দর্য আরও চোখজুড়ানো হয়ে ওঠে।
ইয়ংটং চা বাগান থেকে বৈজুখেতে যাওয়ার পথেই একটি পাকা রাস্তা ধরে কুমাই, জলঢাকা এবং ঝালং যাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বৈজুখেতের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কাঁচা রাস্তা ধরে পৌঁছানো যায় লালিগুরাস পর্যটন এলাকায়, যেখানে নদীর ধারে অনায়াসে নেচার ক্যাম্প করা সম্ভব। এলাকাবাসী চাইছেন, বৈজুখেত থেকে পর্যটকদের ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে লালিগুরাস ঘুরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে। নীলমের মতে, রাজ্য সরকার যদি এখানে কটেজ তৈরি করে, তবে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নতি হবে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
নাগরাকাটা বিধানসভার অন্তর্গত এই এলাকার বিধায়ক পুনা ভেংরা। ইয়ংটংয়ের বাসিন্দারা বৈজুখেতের উন্নতির জন্য তাঁর কাছে আবেদন করলেও, তিনি কিছুই করেননি বলে অভিযোগ। এমনকি আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে বিধায়ক ও সাংসদ উভয়েই জানিয়েছেন যে, তৃণমূল সরকারের আমলে বারবার বলেও কোনও লাভ হয়নি। এখন তাঁদের সরকার আসায় তাঁরা পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
মেটেলিহাট পঞ্চায়েতের অধীনে থাকা এই এলাকাটি নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও কম নয়। যখন তৃণমূল ক্ষমতায় ছিল, তখন ইয়ংটং চা বাগান থেকে একমাত্র বিজেপি সমর্থিত সদস্য হিসেবে ধনরাজ তামাং জয়ী হয়েছিলেন। তাঁর দাবি, সেই সময় তিনি বৈজুখেতকে ডুয়ার্সের পর্যটন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্লক ও জেলা প্রশাসনে লিখিত আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার উত্তরবঙ্গকে সুইৎজারল্যান্ড করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তাঁদের এই প্রস্তাবকে কোনও গুরুত্ব দেয়নি। ধনরাজের বক্তব্য, ‘রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার এসেছে। আমরা চাই নতুন সরকার বৈজুখেতকে পর্যটন মানচিত্রে স্থান দিয়ে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন করুক।’

