উলটপুরাণ
সমগ্র বিশ্বেই এখন প্রকৃতির এক অদ্ভুত খামখেয়ালিপনা চলছে। যখন তীব্র গরমে পুড়ছে ইউরোপের একাধিক দেশ, তখন আমাদের উত্তরবঙ্গ টানা বৃষ্টিতে ভেসেছে। ঋতুচক্রের এই ছন্দপতনে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির বহুদিনের চেনা নিয়ম। ফাল্গুনে অকালবৃষ্টি কিংবা বর্ষার দীর্ঘস্থায়ী দাপটে কৃষি, অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনের পরিচিত কাঠামো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী উন্নত বিশ্বের অতিভোগের মাশুল আজ দিচ্ছেন গ্লোবাল সাউথের প্রান্তিক মানুষ। জলবায়ুর কোনও কাঁটাতারের সীমানা নেই, কিন্তু দূষণের ঐতিহাসিক দায় স্পষ্ট। এই নতুন বাস্তবতায় সম্মিলিত বৈশ্বিক উদ্যোগ ও জলবায়ু-ন্যায়বিচারই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই বহুমাত্রিক সংকটের নানা দিক নিয়েই আজকের উত্তর সম্পাদকীয়।
ডঃ বিকাশ দাস
এই বছর ইউরোপের বহু দেশ ইতিহাসের অন্যতম তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে বর্ষা যেন প্রতি বছরই আরও দীর্ঘ, আরও অনিশ্চিত, আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। বর্ষাকালে আলিপুরদুয়ার–ফালাকাটা জাতীয় সড়ক প্রায় প্রতিবছরই একাধিকবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঢেকলাপাড়া, বান্দাপানি, সেন্ট্রাল ডুয়ার্সের মতো বহু চা বাগান দিনের পর দিন কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবন সহ উপকূলের বহু জনপদ অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে দাবানল, অন্য প্রান্তে বন্যা। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, আসলে এগুলি একই সংকটের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। এক সময় মনে করা হত জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের সমস্যা। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করতেন, সম্মেলন হত, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হত, কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার তেমন প্রতিফলন দেখা যেত না। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন এখন কোনও গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি কৃষকের মাঠে, চা বাগানের শ্রমিকের জীবনে, পাহাড়ি জনপদের ভাঙা রাস্তায়, শহরের হাসপাতালের শয্যায় এবং আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় উপস্থিত।
জলবায়ুর কোনও পাসপোর্ট নেই, কিন্তু দূষণের ইতিহাসের আছে। পৃথিবীর যে দেশগুলি শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ভোগবাদী উন্নয়নের মডেলের ধ্বজা উড়িয়ে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণে কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছে তারাই। অতি-ভোগের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে যে সাম্রাজ্য, তার প্রধান সুফল ভোগ করেছে শুধুমাত্র উন্নত বিশ্ব। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত বহন করছে সেইসব দেশ ও জনগোষ্ঠী, যাদের এই সংকট তৈরিতে ভূমিকা ছিল সবচেয়ে কম, যাদের মাথাপিছু কার্বন নির্গমন, জ্বালানি ব্যবহার এবং প্লাস্টিক ভোগ পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় প্রায়ই জনসংখ্যার প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেবল জনসংখ্যাই কি আসল সমস্যা? বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু জ্বালানি ব্যবহার, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় বহুগুণ বেশি। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একজন মার্কিন নাগরিকের মাথাপিছু কার্বন নির্গমন বছরে প্রায় ১৪ টন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৫–৬ টন, অথচ ভারতের ক্ষেত্রে তা মাত্র প্রায় ২ টন। একইভাবে উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনও উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায় বহু গুণ বেশি। অথচ জলবায়ু সংকটের দায় প্রায়ই জনবহুল গ্লোবাল সাউথের ঘাড়ে চাপানো হয়। সভ্যতার জয়যাত্রার ইতিহাসে তাদেরই মানুষ বিজয়ী বলে সমীহ করল যারা ধ্বংস করল বেশি। অথচ যারা হাজার বছর ধরে প্রকৃতিকে দু’হাতে রক্ষা করে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে জীবন ধারণ করে চলেছে তাদেরকে আমরা পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ বলে দাগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় তাই জনসংখ্যার হিসাবের পাশাপাশি মাথাপিছু ভোগ ও ঐতিহাসিক নির্গমনের হিসাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
জলবায়ুর সংকট সবার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সমাজের সকল মানুষের উপর সমানভাবে পড়ে না। রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়াও সমাজের ভেতরে শ্রেণি, জাত, লিঙ্গ ও জাতিগত বৈষম্য নির্ধারণ করে কে প্রকৃতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে আর কে সেই ক্ষতির সবচেয়ে নির্মম পরিণতি বহন করবে। শহরের একজন সচ্ছল মানুষ গরম থেকে বাঁচতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে আশ্রয় নিতে পারেন, কিন্তু দিনমজুর, প্রান্তিক কৃষক বা চা বাগানের শ্রমিকের সে সুযোগ নেই। একইভাবে, বন্যার পরে দ্রুত ঘর মেরামত করার সামর্থ্যও সবার সমান নয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক হলেও তার ক্ষতি গভীরভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক। দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং জলবায়ু সংকট পরস্পরকে আরও জটিল করে তোলে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় বিতর্কও এখানেই। উন্নয়নশীল দেশগুলি বহুদিন ধরেই বলছে, জলবায়ু মোকাবিলার দায় সবার হলেও দায়িত্ব সমান হতে পারে না। যে দেশগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সবচেয়ে বেশি দূষণ করেছে, তাদেরই নির্গমন দ্রুত কমাতে হবে এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলিকে প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিশ্রুতি যতটা বড়, তার বাস্তবায়ন ততটা দৃশ্যমান নয়। ফলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা প্রায়ই পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং কূটনীতির প্রশ্নে গিয়ে দাঁড়ায়। যে দেশগুলি কয়েক শতাব্দী ধরে শিল্পায়নের নামে আকাশ ভরেছে কার্বনের ধোঁয়ায়, আজ তারাই কার্বন বাণিজ্যের নতুন বাজার তৈরি করে উন্নয়নশীল দেশগুলির বন, নদী আর পাহাড়কে নিজেদের নির্গমনের ক্ষতিপূরণের খাতায় লিখতে চায়। যেন এক অংশ পৃথিবী নির্বিঘ্নে ভোগ করবে, আর অন্য অংশ চিরকাল বন রক্ষা, কার্বন শোষণ আর ত্যাগের দায় বইবে। প্রকৃতিরও কি তবে নতুন এক ঔপনিবেশিক মানচিত্র আঁকা হচ্ছে? প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা একজন গবেষক হিসেবে এই প্রশ্ন আমাকে বারবার ভাবায়। যে মানুষগুলোর নিজের জমিই নেই, যাদের জীবন প্রজন্মের পর প্রজন্ম অরণ্য, নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে কেটেছে, তাদেরই আবার নতুন করে বন তৈরির দায় কেন নিতে হবে? প্রশ্ন কেবল কত গাছ লাগানো হল, তা নয়; প্রশ্ন হল, কে কার জন্য গাছ লাগাবে, কে শিল্প গড়বে, আর কে চিরকাল অন্যের ভোগের মূল্য নিজের জীবন দিয়ে পরিশোধ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। পৃথিবীকে রাজনৈতিক মানচিত্রে অসংখ্য রেখা দিয়ে ভাগ করা গেলেও প্রকৃতি সেই রেখাগুলিকে মানে না। এক দেশের কারখানার ধোঁয়া, অন্য দেশের বন উজাড় কিংবা আরেক দেশের অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার শেষপর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীর জলবায়ুকেই প্রভাবিত করে। উত্তরবঙ্গ এই বৈশ্বিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পূর্ব হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চলের একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত উত্তরবঙ্গের নদী, কৃষি, চা বাগান ও জনজীবনেও স্পষ্ট। তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা, রায়ডাক কিংবা সংকোশ—এই নদীগুলির চরিত্র বদলে গেলে কৃষি, পানীয় জল, জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং মানুষের নিরাপত্তা—সবকিছুই নতুন করে ভাবতে হয়।
সমাধান শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণায় নয়, উন্নয়নের ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে হবে। একইসঙ্গে স্বীকার করতে হবে, এই সংকটের জন্য সবাই সমানভাবে দায়ী নয়, আবার এর অভিঘাতও সবাই সমানভাবে বহন করে না। যে উন্নয়নের সুফল একদল মানুষ ভোগ করেছে, তার পরিবেশগত মূল্য অন্যদের কাঁধে চাপিয়ে দিলে জলবায়ু-ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জলবায়ুর কোনও সীমানা নেই, কিন্তু দায়িত্বের একটি ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসকে স্বীকার করেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক ন্যায়নীতির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে।
(লেখক কাশ্মীর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক, ফালাকাটার বাসিন্দা)

