প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। ভোটের আগে প্রতিটি বিধানসভার সেইসব গোপন রাজনৈতিক রসায়নের কথা তুলে ধরছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ
শুভঙ্কর চক্রবর্তী, দিনহাটা: ‘শোনও শোনও বন্ধুগণ শোনও দিয়া মন, বাংলার উন্নয়ন…’ – দূর থেকে ভেসে আসা পাঁচালির সুরে মুখেচোখে বিরক্তি ফুটে ওঠে মদনের, ‘এই যে, সাতসকালে চালু হয়া গেইল। হামরা কাজ করি তাল না পাই আর উমার খালি উন্নয়ন। কোটে উন্নয়ন হইছে কায় জানে।’ (এই যে সাতসকালে চালু হয়ে গেল। আমরা কাজ করে তাল পাই না, ওদের খালি উন্নয়ন। কোথায় উন্নয়ন হয়েছে কে জানে) টোটোতে ধূপকাঠি দেখিয়ে প্রণাম করে বিড়বিড় করতে থাকেন মদন। রওনা হওয়ার আগে স্ত্রী এসে মনে করান ছেলের স্কুলে ইউনিফর্ম, বইয়ের টাকা দেওয়ার তারিখ পেরিয়ে গিয়েছে৷ অস্ফুট স্বরে ‘দেখছি’ বলে টোটো স্টার্ট দেন তিনি। পাশের চায়ের দোকানে বাইকে বসেই হাঁক দেন এক ব্যক্তি, ‘ওই মদন, মিটিংয়ের কথা মনে আছে তো? বাবুনদা আসবে কিন্তু।’ হাত নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মূল রাস্তা ধরে এগিয়ে যান মদন। শীতের সকালের কুয়াশা তখনও কাটেনি। নেতার সামনে মদনের সম্মতি ধোঁয়াশাই তৈরি করে।
খেরবাড়িহাট বাজারে চায়ের আসর জমে এসআইআর (SIR)-এর আলোচনায়। সেখান থেকে রাজ্য ও দেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক জমান বাবলু দাস, ইয়াকুব মিয়াঁরা। উদয়ন গুহ না তাঁর ছেলে এবার দিনহাটা (Dinhata) বিধানসভায় প্রার্থী হবেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণও চলে। নিশীথ প্রামাণিক মাঠে নামলে খেলা ঘুরে যেতে পারে বলেও জানান কেউ কেউ। সেই আলোচনার কোনও শেষ নেই। একজন উঠে যায় তো অন্যজন এসে আসরে যোগ দেন। নিশীথের কথা শুনে আলোচনায় ঢোকেন চা দোকানি। বলেন, ‘বাবুনদা (উদয়ন)-কে তো গ্রামে পাওয়াই যায়, কিন্তু শহরের হাওয়াটা বোঝা মুশকিল।’ প্রাক ভোটের এই সংলাপই আসলে বর্তমান দিনহাটার রাজনৈতিক আবহ কেমন তা বুঝিয়ে দেয়।
দিনহাটা পুরসভা, ২ নম্বর ব্লক এবং ১ নম্বর ব্লকের ভেটাগুড়ির দুটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে দিনহাটা বিধানসভা গঠিত। পর্দার বাইরে উদয়ন এখানকার বেতাজ বাদশা। আপাতত তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। কিন্তু পর্দার আড়ালের খেলা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আড়ালে যে খেলা চলছে তাতে সন্দেহ নেই। সেই খেলা বুঝে চাল দিয়ে কে কিস্তিমাত করবে তা ভোট যত এগোবে ততই পরিষ্কার হবে। দিনহাটায় বিজেপির নেতা নেই, কর্মী হাতেগোনা, কর্মসূচিও সেই অর্থে শূন্য, কিন্তু সমর্থক প্রচুর। সেই সমর্থকরা কেউ বিজেপিপ্রেমী, কেউ তৃণমূল বিরোধী। তবে উদয়নবাহিনীর ভয়ে তাঁরা প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে অনেক দূরে থাকেন। সেই অদৃশ্য সমর্থকদের একজোট করতে পারাটাই চ্যালেঞ্জ গেরুয়া শিবিরের কাছে। চ্যালেঞ্জ একটা অবশ্য তৃণমূলেরও আছে, সেই অদৃশ্য সমর্থকদের চিহ্নিত করা। কারণ, ওই অদৃশ্য সমর্থকরাই ভোটে জয়-পরাজয় ঠিক করবে। এই দৃশ্যমান বিরোধীহীনতা উদয়নের কাছে স্বস্তির চেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনহাটায় এখন পরিস্থিতি এমন যে, ঘরের ভেতরেই শত্রু বিভীষণ হয়ে বসে আছে কি না, তা বোঝার উপায় নেই।
দিনহাটা শহরের অলিগলি এখন বেশ ঝকঝকে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে অনেক জায়গায়। উদয়ন গুহ (Udayan Guha) নিজে শহরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, শহুরে শিক্ষিত ভোটারদের একটা বড় অংশের কাছে উদয়ন এখনও যেন ‘অচেনা’ নেতা। তাঁর এখনও উদয়নকে ভোটে জেতাতে চান না। এই গ্রহণযোগ্যতার অভাবের মূলে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। শহরের মানুষ প্রতিনিয়ত দেখছেন, একদল বহিরাগত তরুণ এবং মাসলম্যানদের দাপাদাপি। প্রকাশ্যে তৃণমূলের দাপট এতটাই যে শহরের মানুষ বিরক্ত। তলে তলে তাঁদের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ পুর এলাকায় ‘সাইলেন্ট ভোটার’-এর সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। সেই ভোটাররা যে কোনও ছক বদলে দিতে পারে। বহু চেষ্টাতেও সেই ভোটারদের বাগে আনতে পারেননি উদয়নের বাহিনী। আবার সাম্প্রতিক সময়ে উদয়নের খাস তালিকা থেকে দলের নেতা বিশু ধরের খানিকটা সরে যাওয়া এবং সাবির সাহা চৌধুরীর উঠে আসা, নামেই তৃণমূলে থাকা জয় ঘোষের সঙ্গে উদয়নের দূরত্ব অনেক জল্পনাই উসকে দিতে শুরু করেছে।
গ্রামের দিকে তাকালে সমীকরণটা আরও একটু জটিল। বিশেষ করে দিনহাটা-২ ব্লকের রাজনৈতিক মানচিত্রে মীর হুমায়ুন কবীরের নামটা একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন। তৃণমূলের (TMC) টিকিটে জেলা পরিষদে জিতলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় নন। তাঁর নীরবতাই এখন উদয়নের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের ওপর উদয়ন বিরোধী হুমায়ুনের যে প্রভাব, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি নিজে কিছু না বললেও তাঁর অনুগামীরা কোন দিকে পা বাড়াবেন, তার ওপর দিনহাটা বিধানসভার অনেক অঙ্ক নির্ভর করছে। দলীয় নেতার এই রহস্যময় নীরবতা শাসক শিবিরের জন্য অশনিসংকেত। দিনহাটা-২ ব্লকই দিনহাটা বিধানসভার প্রাণভোমরা। সেখানে হুমায়ুনের মতোই তৃণমূলের আর এক কাঁটার নাম বিষ্ণুপদ সরকার। ঘাসফুল শিবিরের ওই প্রাক্তন ব্লক সভাপতিও আপাতত ব্রাত্যদের তালিকায়। ভোটের মাঠে তিনি কীভাবে খেলবেন তা বোঝা দায়।
আবার বড়শাকদল গ্রাম পঞ্চায়েতে বাহুবলী রাজনীতির এক অদ্ভুত প্যাঁচ তৈরি হয়েছে। তাপস দাসের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে শক্তি বৃদ্ধি মনে হলেও, তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যখন তাপস বিজেপি-তে গিয়েছিলেন, তখন সেই এলাকার আদি বিজেপি কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। অনেকে আবার বিজেপি-কে সবক শেখাতে তলে তলে তৃণমূলকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করেছিলেন। উদয়ন গুহ সেই সুযোগে বিরোধী ভোটকে অনেকটা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাপস তৃণমূলে ফিরতেই চিত্রটা বদলে গিয়েছে। পুরোনো বিজেপি কর্মীরা এখন আবার একজোট হওয়ার রসদ খুঁজে পাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিজেপি-তে থাকাকালীন তাপস যে তৃণমূল কর্মীদের ওপর দাদাগিরি করেছিলেন, সেই নীচুতলার কর্মীরা এখন তাপসকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না। এই চাপা অসন্তোষ আর অভিমানে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি ভেতর থেকে ফোকলা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উদয়ন গুহ এলাকায় উন্নয়ন করেছেন, মানুষের প্রয়োজনে সাড়াও দেন, কিন্তু প্রায় সবক্ষেত্রেই তাঁর হুমকি উন্নয়নের পাঁচালির আওয়াজের থেকে বেশি জোরে বাজছে। সব মিলিয়ে দিনহাটা বিধানসভা এখন এক কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার সামনে। বিধানসভাজুড়ে নীচু স্বরের আলোচনাগুলো অন্তত এটুকুই ইঙ্গিত দিচ্ছে, উদয়নের লড়াইটা এবার বাইরের শত্রুর চেয়ে অনেক বেশি ঘরের ছায়াদের সঙ্গে। দিনশেষে কোচবিহারের এই জনপদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে সেই নীরব ভোটারদের হাতেই, যারা প্রকাশ্যে তৃণমূল হলেও গোপনে হয়তো অন্য কোনও হিসেব কষছেন।
