উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বাদল অধিবেশন শুরুর ঠিক মুখেই দেশের জাতীয় রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন এবং নয়া সমীকরণের জন্ম দিল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই। লোকসভার ভেতর আইনি জটিলতা ও সাংসদ পদ খারিজের খাঁড়া এড়াতে এক চরম ‘কৌশলী’ চাল চাললেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা। দিল্লির দরবারে স্রেফ পৃথক গোষ্ঠী বা দল গঠন না করে, সরাসরি ত্রিপুরার এক নামসর্বস্ব, প্রায় ‘অস্তিত্বহীন’ আঞ্চলিক দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (Nationalist Residents Social gathering of India)-র সাথে নিজেদের সংযুক্তিকরণের (Merger) আর্জি জানিয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ শিবির।
রবিবার কলকাতা বিমানবন্দর থেকে দিল্লি রওনা হওয়ার আগে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার একপ্রকার বোমা ফাটিয়ে দাবি করেছেন, সংখ্যাটা ২০ নয়, তাঁদের সঙ্গে বর্তমানে রয়েছেন ২২ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) সঙ্গে দেখা করে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বকে সামনে রেখে সংসদে পৃথক ব্লকে বসার আনুষ্ঠানিক দাবি জানাতে চলেছেন। এই চাঞ্চল্যকর পটপরিবর্তনের ফলে লোকসভায় ২৮টি আসন বিশিষ্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় দলের শক্তি এক ধাক্কায় মাত্র ৬ থেকে ৮ জনে এসে ঠেকতে পারে, যা দিল্লির বুকে বিরোধী জোটের ভারসাম্যকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিতে চলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের পোড়খাওয়া আইনজীবীদের পরামর্শে তৈরি এক নিখুঁত আইনি ছক। ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে ইংরেজি দৈনিক ‘মিলেনিয়াম পোস্ট’ এবং হিন্দি পত্রিকা ‘সমিজ্ঞাতে’ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’। দলটি মূলত অসম ও ত্রিপুরায় জনজাতিদের নিয়ে কাজ করলেও, এর প্রধান কার্যালয়টি (হোল্ডিং নম্বর ৪৭৯, নটপাড়া) অবস্থিত হাওড়ার বাঁকড়ায় (পিন: ৭১১৪০৩)। ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিলেও এই দল কোনও দাগ কাটতে পারেনি। তবে রাজনৈতিক অন্দরমহলের খবর, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ বিপ্লব দেবের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরেই এই অখ্যাত রাজনৈতিক দলটিকে নিজেদের ‘আইনি ঢাল’ হিসেবে বেছে নেন তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’রা।
কাকলিদের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’-এর মূল কারণ ভারতীয় সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-defection Regulation)। আইন অনুযায়ী, কোনো দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সাংসদ বা বিধায়ক একসঙ্গে দল ছাড়লে তবেই তাঁদের পদ রক্ষা পায়। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জনের মধ্যে ২২ জন (অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি) এককাট্টা হওয়ায় দলত্যাগ বিরোধী আইনের প্রথম বাধা তাঁরা পার করেছেন। তবে সম্পূর্ণ নতুন দল গড়ে লোকসভার স্পিকারের কাছে স্বীকৃতি চাওয়াটা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং আইনি দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। সেই কারণেই আগে থেকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত (Registered) একটি দলের সাথে নিজেদের ‘একত্রীকরণ’ বা ‘মার্জার’ দেখিয়ে সরাসরি নতুন সংসদীয় ব্লক দাবি করছেন তাঁরা।
বিদ্রোহী শিবিরের এই মরিয়া চালের পাল্টা হিসেবে তড়িঘড়ি কোমর বেঁধে নেমেছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও। রবিবার বিকেলেই তৃণমূলের ‘মমতাপন্থী’ দুই সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষকে দিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি চিঠি পাঠিয়েছেন দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সাম্প্রতিক রায়ের আইনি ব্যাখ্যাকে হাতিয়ার করে তৃণমূলের মূল যুক্তি হলো, “আইনসভায় কোনো দলের অস্তিত্ব বা বৈধতা তৈরি হয় মূল রাজনৈতিক দলটির (Political Social gathering) মাধ্যমে। ‘লেজিসলেচার পার্টি’ বা আইনসভার সদস্য বা সাংসদদের কোনো অংশ নিজেদের ইচ্ছামতো মূল রাজনৈতিক দলের অবাধ্য হয়ে স্বাধীন গোষ্ঠী বা অন্য দলের সঙ্গে সংযুক্তির দাবি করতে পারেন না।” তৃণমূলের দাবি, দলত্যাগ বিরোধী আইনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে পলিটিক্যাল পার্টির ওপর। ফলে এই ২২ জন সাংসদ চাইলেই স্পিকারের কাছে নিজেদের পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে দাবি করতে পারেন না।
