TMC Chief Kajal Ghosh | মিষ্টি ফেরি থেকে বিধাননগরের ‘বেতাজ বাদশা’

শিক্ষা
Spread the love


সৌরভ রায়, ফাঁসিদেওয়া : সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিসরে বাড়ছে ফাঁসিদেওয়া ব্লকের বিধাননগর। আনারস চাষের জন্য প্রষিদ্ধ এলাকাটির বুক চিরে চলে গিয়েছে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক। রাস্তা ধরে এগোতে চোখে পড়বে আনারসের আড়ত। ঠিক বিপরীতে বিধাননগর তদন্তকেন্দ্র। তার পেছনেই বাড়ি তৃণমূল নেতা কাজল ঘোষের। কল্যাণী গোস্বামী নামে এক বৃদ্ধার জমি দখল ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে শনিবার ফাঁসিদেওয়া থানা তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আর তার পর থেকে পাড়ার মোড় থেকে চায়ের ঠেক– সর্বত্র চর্চার কেন্দ্রে কাজল। কেউ বলছেন, ‘বেশ হয়েছে’, কারও বক্তব্য, ‘ঔদ্ধত্যের অবসান’, আবার কারও প্রশ্ন, ‘কাজল তো গ্রেপ্তার হলেন, কিন্তু যাঁরা তাঁর থেকে সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের কী হবে?’ রবি ও সোমবার এলাকা ঘুরে এমনই গুঞ্জন কানে এল।

এ প্রসঙ্গে রাজ্যের অর্থ ও পরিবহণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনের বক্তব্য, ‘কাজল ঘোষ যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছেন, তাঁর গ্রেপ্তার হওয়া ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। উপযুক্ত সাজা পাবেন তিনি।’ ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য টুলটুলি সরকার বলছেন, ‘দল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কাজলদাই সব সিদ্ধান্ত নিতেন।’ একই বক্তব্য বিধাননগর-১’এর প্রধান জ্যোতি খালকোরও।

তবে কাজলের উত্থান যে কোনও সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে। স্থানীয় সূত্রের খবর, আটের দশকের শুরুতে অসমের জোরহাট থেকে বিধাননগরে এসেছিল কাজলের পরিবার। ক্ষুদিরামপল্লি এলাকায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় তাঁদের। পরিবারে তখন অনটন। বাবা র‍্যাশন দোকানে চারশো টাকা বেতনে কেরোসিন তেল মাপার কাজ করতেন। অনটন ঘোঁচাতে মাঠে-ঘাটে কাজ করতেন পরিবারের সদস্যরা। এমনকি কাজল ও তাঁর বাবা একসময় গ্রামে গ্রামে হেঁটে মিষ্টিও ফেরি করেছেন। সেখান থেকে অবিশ্বাস্য উত্থান। চার দশকে একাধিক চা কারখানা, থ্রি-স্টার মানের হোটেলের অংশীদারিত্ব, ডজন ডজন জমির প্লট সহ বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে যান কাজল।

কিন্তু কীভাবে বিধাননগরের ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে উঠলেন তিনি? প্রবীণ নেতারা বলছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে ওঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দলবদলের নিখুঁত সমীকরণ, অর্থ ও বাহুবল। ১৯৮৭-’৮৮ সাল নাগাদ বিধাননগরে আনারসের কারবারে পা রাখেন কাজল। স্থানীয় বাসিন্দা মন্টু ঘোষের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে অবশ্য অংশীদারিত্ব ছেড়ে এককভাবে ব্যবসার উদ্যোগ নেন। নয়ের দশকের শুরুতে স্থানীয় অপর এক ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে চা কারখানায় কাঁচা পাতা সাপ্লাই শুরু করেন কাজল। এতে লক্ষ্মীলাভ হয় তাঁর৷ তবে বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, এর পেছনেও কারচুপি ছিল।

তিনটি যাত্রীবাহী বাসও কিনেছিলেন কাজল। হাতে প্রচুর টাকা চলে আসায় ক্ষুদিরামপল্লি ছেড়ে বিধাননগর তদন্তকেন্দ্রের পেছনে বিশাল জমি কেনেন তিনি। যদিও পরিবহণ ব্যবসায় দেনায় জড়িয়ে একসময় ঋণখেলাপের দায়ে তাঁর ছবি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিধাননগর শাখায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

কাজল এটা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতা জাহির করতে রাজনীতির অলিন্দে থাকা জরুরি। সেই ভাবনা থেকে বিধাননগরের দাপুটে সিপিএম নেতা বীরেন নন্দীর আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। তাঁর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ। ২০০৪ সালে সিপিএমের প্রতীকে পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচনে প্রার্থী হন। ওই সিপিএম নেতার মধ্যস্থতায় কলকাতার এক মালিকের বন্ধ হয়ে যাওয়া চা কারখানা হস্তগত করেন কাজল। স্থানীয় বাসিন্দা নিতাই মজুমদার এবং ভজহরি ভৌমিকের সঙ্গে অংশীদারিত্বে গড়ে তোলেন বটলিফ চা কারখানা। পরে যদিও দুজনকে সরিয়ে কারখানার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন কাজল। ওই কারখানার জমি নিয়েই অভিযোগ তুলেছেন কল্যাণী গোস্বামী। যার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ‘বেতাজ বাদশা’।

২০১০ সালে ঘাসফুল শিবিরে ভিড়ে যান কাজল ঘোষ। পুরোনো নেতাদের কোণঠাসা করে ফাঁসিদেওয়া ২ ব্লক সভাপতি পদ ছিনিয়ে নেন। ২০১৫ সালে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হন। পরে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসজেডিএ)-র বোর্ড মেম্বার ছাড়াও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন। কাজলের বিরুদ্ধে দলের আদি নেতা-কর্মীদের ব্রাত্য করে দেওয়ার ভূরিভূরি অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁর হুকুম ছাড়া ব্লকে কারও পদ পাওয়ার জো ছিল না। বিধাননগর-১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতিতে ঘনিষ্ঠদের বসিয়ে আড়াল থেকে ছড়ি ঘোরাতেন কাজল।

তৃণমূল নেতা তথা বিধাননগর ১-এর প্রাক্তন প্রধান পীযূষ সিং বলছেন, ‘ওঁর প্রভাব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। ভয়ে চুপ থাকলেও, দলের নেতা-কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ- সকলে কাজলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। সঠিক তদন্ত হলে, ওঁর অনেক দুর্নীতি সামনে আসবে।’ একসময় কাজল-ঘনিষ্ঠ তথা ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি প্রণবেশ মণ্ডলের কথা, ‘কাজল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। বিএ পাশের জাল সার্টিফিকেট দাখিল করে ঘোষপুকুর কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি পদ দীর্ঘদিন দখলে রেখেছিল। ওর শিক্ষাগত যোগ্যতার নথিও যাচাই প্রয়োজন।’ এদিকে, কাজল যে পেছন থেকে ছড়ি ঘোরাতেন, তা স্পষ্ট মহকুমা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি রোমারেশমি এক্কার মন্তব্যে, ‘কে টিকিট পাবেন, কে কোন দায়িত্ব নেবেন- সবটাই সামলাতেন কাজলদা। অনেকে শুধু নামমাত্র দায়িত্বে থাকতেন। পেছন থেকে দাদাই সামলাতেন।’

কাজলের গ্রেপ্তারির পর তাঁর সংস্পর্শে থেকে ‘অন্যায় সুবিধা’ আদায়কারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকে নজর আমজনতার।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *