প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটতেই যেন উল্টে গেল পাশা। ক্ষমতার দাপট চলে যেতেই আর শেষরক্ষা হলো না পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের ‘কুখ্যাত’ তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন ব্লক সভাপতি মেহেমুদ খানের (TMC chief arrested)। গা ঢাকা দিয়েও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারলেন না তিনি। দলবল নিয়ে মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলাবাজি (Extortion Case), মারধর ও খুনের হুমকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে জামালপুর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবারই ধৃত মেহেমুদ খানকে জামিন অযোগ্য একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়। ঘটনার গভীরে পৌঁছাতে তদন্তকারী অফিসার ধৃতকে ১০ দিনের জন্য নিজেদের হেপাজতে নেওয়ার আবেদন জানান। তবে সমস্ত দিক বিবেচনা করে সিজেএম (CJM) ধৃত তৃণমূল নেতাকে ৫ দিনের পুলিশি হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
পুলিশ সূত্রের খবর, গত ৮ জুলাই জামালপুরের সালালপুর গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পণ্ডিত থানায় মেহেমুদ খান ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ এই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ২০২৪ সাল থেকে মেহেমুদ খান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর কাছ থেকে দফায় দফায় ১২ লক্ষ টাকা দাবি করছিলেন। প্রাণভয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বজিৎবাবু ৬ লক্ষ টাকা দিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও শান্ত হয়নি মেহেমুদ ও তার বাহিনী। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা নাগাদ মেমারি-তারকেশ্বর রোড ধরে বাড়ি ফেরার সময় সেলিমাবাদের কাছে বিশ্বজিৎবাবুর পথ আটকায় মেহেমুদ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। অভিযোগ, ওই দলে মেহেমুদের ছায়াসঙ্গী তথা আঝাপুর অঞ্চলের ‘ডাক্তার’ নামে পরিচিত তৃণমূল নেতা প্রতাপ রক্ষিত সহ আরও বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিল।
বিশ্বজিৎ পণ্ডিতের অভিযোগ অনুযায়ী, পথ আটকে মেহেমুদ খান তাঁকে দাবিমতো টাকা না দিলে সপরিবারে প্রাণে মারার হুমকি দেন। এমনকি পাঞ্জাবির পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে বিশ্বজিৎবাবুর মাথায় ঠেকায় সে। তখনই মেহেমুদের দলবল তাঁকে ব্যাপক মারধর শুরু করে। ওই সময় রাস্তা দিয়ে কিছু পথচারীকে আসতে দেখে দুষ্কৃতীরা চম্পট দেয়। পরবর্তীকালে পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে আরও ১ লক্ষ টাকা জোগাড় করে দিতে বাধ্য হন বিশ্বজিৎবাবু। কিন্তু বাকি ৫ লক্ষ টাকার জন্য লাগাতার হুমকি আসতেই থাকে। বিশ্বজিৎবাবুর কথায়, “তৃণমূল জমানায় আতঙ্কে থানায় যাওয়ার সাহস পাইনি। রাজ্যে পালাবদল ঘটতেই অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছি।”
বিজেপির সুর চড়া, ইডি তদন্তের দাবি
এই ঘটনা নিয়ে জামালপুরের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দলের নেতার এই কীর্তি নিয়ে ব্লকের অন্যান্য তৃণমূল নেতৃত্ব মুখে কুলুপ আঁটলেও, তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার। বিধায়ক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “রাজ্যে সরকার বদল হতেই এই মেহেমুদ খানের আসল রূপটা মানুষের সামনে চলে এলো। ওর বিরুদ্ধে হুমকি, তোলাবাজি ও দুর্নীতির স্তূপাকার অভিযোগ জমা পড়ছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এরা মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর টাকা ও সম্পদ আত্মসাৎ করতেও ছাড়েনি। জামালপুরের ব্লক সভাপতি হওয়ার পর দামোদর নদ থেকে বালি লুটের (Damodar sand mining rip-off) একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল এই মেহেমুদ।”মেহেমুদের এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পত্তি ও ধন-দৌলতের উৎস খুঁজতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘ইডি’ (ED)-কে দিয়ে তদন্ত করানোর জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে দরবার করবেন বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন অরুণ হালদার।
ভোটের রাতেই কি পাচার হয়েছিল কোটি কোটি টাকা?
এদিকে মেহেমুদ খানের গ্রেপ্তারি নিয়ে মুখ খুলেছেন জামালপুরের এক মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রী মীরাতাজ শেখ। তাঁর দাবি অত্যন্ত বিস্ফোরক। মীরাতাজ জানান, গত ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন রাত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে মেহেমুদ খান তাঁর জামাইকে দিয়ে পার্টি অফিস থেকে বড় বড় ৪ ব্যাগ ভর্তি টাকা এবং বিপুল পরিমাণ জমির দলিল অন্য জায়গায় পাচার করে দিয়েছিল। একজন ব্লক স্তরের নেতার কাছে এত টাকা এবং দলিল কোথা থেকে এলো, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ওই নেত্রীও। আপাতত ৫ দিনের পুলিশি হেফাজতে মেহেমুদ খানকে জেরা করে এই তোলাবাজি চক্র, বালি পাচার এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির নেপথ্যে আর কার কার হাত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে জামালপুর থানার পুলিশ।

