রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: ভারতের বাজারে নেপালের চা আমদানি আটকাতে কার্যকরী পদক্ষেপ করতে পারছে না চা পর্ষদ (Tea)। এমনকি ওই দেশের চায়ের গুণগত মান পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পপতিদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, বারবার আর্জি জানানো হলেও ভারতে নেপালের চা আসা বন্ধ করতে পদক্ষেপ করছে না টি বোর্ড এবং রাজ্য সরকার। এছাড়া নেপালের চা পরীক্ষা এবং ভেজাল চা রপ্তানি আটকাতে রাজ্যের তরফে ভারত-নেপাল সীমান্তে একাধিক ল্যাবরেটরি তৈরির ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে শ্রম দপ্তর এবং রাজ্যের টি অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদিও এনিয়ে শ্রম দপ্তরের উত্তরবঙ্গের যুগ্ম অধিকর্তা পার্থ বিশ্বাস বলছেন, ‘ল্যাবরেটরি তৈরির বিষয়টি রাজ্য সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।’
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ, ভারতে আসা নেপালের চায়ের মান পরীক্ষার কোনও পরিকাঠামো নেই। ফলে অবাধে আমদানি হওয়ায় ভারতীয় চায়ের বাজার নষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে জমা দেওয়া টি বোর্ডের একটি হলফনামায় দেখা গিয়েছে, ২০২৫ সালে নেপালের চায়ের ৪৩টি নমুনার মধ্যে ২২টিই ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (এফএসএসএআই) পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি দার্জিলিং চায়ের লেবেল সেঁটেও নেপালের চা ভারতের বাজারে বিক্রির জন্য পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। টি বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, নেপাল চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ভারতে ১৫.৯৫ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করেছে। যার মধ্যে এফএসএসএআই-এর গুণগত মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় ২৭ হাজার ৫৭০ কেজি চা বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করা হয়েছে।
এনিয়ে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী তথা টি অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মলয় ঘটক জানিয়েছিলেন, নেপালের চা আটকাতে ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কি, পশুপতি এবং রক্সৌলে ল্যাবরেটরি তৈরি হবে। অনুন্নত এবং ভেজাল চা আটকাতে নজরদারির জন্য আলাদা দল থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেসব কিছুই এখনও হয়নি। বরং পানিট্যাঙ্কি, পশুপতি হয়ে ভারতে দেদারে নেপালের চা আমদানি করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র চা চাষিদের সর্বভারতীয় সংগঠন কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী এবিষয়ে বলেন, ‘নেপালের অনুন্নত চা এভাবে ভারতের বাজারে ছেয়ে যাওয়ায় উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রপ্তানি বন্ধ করার জন্য বহুবার কেন্দ্র ও রাজ্যকে বলা হয়েছে। তবে আশ্বাস মিললেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি আটকাতে জেলা স্তরে প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে তাঁরাও নিয়মিত বৈঠক ডাকেন না।’
২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রকের উদ্যোগে এফএসএসএআই, কাস্টমস এবং টি বোর্ডের মধ্যে এনিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কাস্টমস নেপাল থেকে ভারতে আসা চায়ের ১০০ শতাংশই পরীক্ষা করবে। তারপর প্রতি মাসে ফলাফল নিয়ে টি বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করবে। কিন্তু আদালতে টি বোর্ডের দেওয়া নথিতেই স্পষ্ট, কাস্টমস তা করতে ব্যর্থ। ফলে পাহাড়, তরাই-ডুয়ার্স সহ উত্তরবঙ্গের চায়ের বাজারকে নেপালের চায়ের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করতে কেন্দ্র এবং রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ।
