রুমি বাগচী, লস অ্যাঞ্জেলেস: প্রবাসে নিজের দেশের দল খেলতে এলে অদ্ভুত এক জাদুকরি অনুভূতির জন্ম হয়। গ্যালারিতে বসে জাতীয় সংগীত শুনলে হাজার মাইল দূরের মাতৃভূমি যেন মুহূর্তেই বুকের কাছে নেমে আসে। লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রবাসী সুইস ও বসনিয়দের (Switzerland Vs Bosnia) দিনটাও ছিল ঠিক তেমনই। বাড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ড্রাইভ করে যখন সোফাই স্টেডিয়ামে (SoFi Stadium) পৌঁছালাম, এখানকার কড়া পার্কিং নিয়ম পেরিয়ে স্বস্তি দিল সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া। লস অ্যাঞ্জেলেসের উজ্জ্বল গ্রীষ্ম এমনিতে শিলিগুড়ির এই মেয়ের গায়ে সেভাবে লাগে না। স্কুলগুলিতে এখন লম্বা ছুটি চলায় গ্যালারিজুড়ে অঢেল উৎসবের মেজাজ।
গেটে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এই দুই নিরপেক্ষ দলের ম্যাচে সত্তর হাজারের গ্যালারি ভরবে তো? ভুল ভাঙল ভেতরে ঢুকেই। গ্যালারির এক দিক লাল আর অন্য দিক নীল রঙে প্রায় ঠাসা। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার গল্পটা নিছক ফুটবলের নয়, টিকে থাকার আখ্যান। নব্বইয়ের দশকের যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশবের স্মৃতি বুকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেরা বাঁধা মানুষগুলির কাছে দেশের পতাকাটা এক টুকরো ফেলে আসা জীবনের দলিল। দলের ছাব্বিশ জনের ষোলোজনই জন্মভূমিতে বড় হননি, যুদ্ধের আঁচ থেকে বাঁচতে প্রবাসী। পনেরো বছর পর কোচের চেয়ারে বসা সের্গেই বারবারেজ নিজেও একসময় যুদ্ধকবলিত দেশ ছেড়েছিলেন। এমন আবেগঘন প্রেক্ষাপটে প্রবাসীরা মাঠে এসে তো গলা ফাটাবেনই!
তবে আবেগের এই জমিতে শেষ হাসি হাসল সুইসরাই। প্রথম ম্যাচে কাতারের সঙ্গে ড্র করার পর এই দুর্দান্ত জয়ে তারা গ্রুপ ‘বি’-র শীর্ষে। প্রথমার্ধের ম্যাড়ম্যাড়ে খেলার পর সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিনের কৌশল বদলই ম্যাচের মোড় ঘোরায়। তাঁর কথায়, ‘ব্রেক পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। বিপক্ষ ততক্ষণে ক্লান্ত, তাই গতিশীল খেলোয়াড় নামিয়ে ফাঁকা জায়গার পুরো ফায়দা তুলেছি।’
এই কৌশলেই বাজিমাত। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমে রীতিমতো ঝড় তুললেন জোহান মানজাম্বি (Johan Manzambi)। ৭৪ মিনিটে তাঁর দুরন্ত শটে সুইসদের প্রথম গোল। এরপর ব্রিল এমবোলোকে ফাউল করে বসনিয়ার তারিক মুহারেমোভিচ লাল কার্ড দেখায় ম্যাচের ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ৮৪ মিনিটে রুবেন ভার্গাস ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এবং ৯০ মিনিটে তাঁরই পাসে নিজের দ্বিতীয় গোলটি তুলে নেন মানজাম্বি। মাত্র ২০ বছর ২৪৭ দিন বয়সে জোড়া গোল করে তিনি এখন বিশ্বকাপে সুইৎজারল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ জোড়া গোলস্কোরার। জয়ের নায়কের উচ্ছ্বাস, ‘কেরিয়ারের সেরা মুহূর্ত এটা। জানতাম ধৈর্য ধরতে হবে, আজ প্রমাণ করলাম আমরা দারুণ একটা দল।’
ইনজুরি টাইমের তৃতীয় মিনিটে এরমিন মাহমিচের দূরপাল্লার আগুনে শটে দশজনের বসনিয়া একটি গোল শোধ করলেও ৯৭ মিনিটে সুইস অধিনায়ক গ্রানিথ জাকার (Granit Xhaka) ঠান্ডা মাথার পেনাল্টি গোল কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেয়। দশ ম্যাচের অপরাজিত দৌড় থামার পর হতাশ বসনিয়ান কোচ বারবারেজ বলেছেন, ‘প্রথম এক ঘণ্টা আমরাই ভালো খেলছিলাম। সুইসদের ব্যক্তি নৈপুণ্য আমাদের কড়া শাস্তি দিল। তবে গ্রুপের শেষ ম্যাচটা আমরা জেতার চেষ্টা করব।’
লস অ্যাঞ্জেলেসের নরম রোদে সুইৎজারল্যান্ড আজ বিজয়ী নায়ক, আর বসনিয়া রয়ে গেল এক সাহসী অথচ ট্র্যাজিক চরিত্র।

