উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ দীর্ঘ শারীরিক লড়াই এবং একের পর এক চোট-আঘাতের কাছে হার মেনে পেশাদার অ্যাথলেটিক্সকে চিরতরে বিদায় জানালেন দেশের প্রথম এশিয়ান গেমস সোনাজয়ী হেপ্ট্যাথলিট স্বপ্না বর্মন (Swapna Barman retirement)। শুক্রবার এক আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে তিনি খেলাধুলা থেকে অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন। ২৯ বছর বয়সি এই কৃতি অ্যাথলেট জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে পিঠের স্লিপ ডিস্ক এবং হাঁটুর গুরুতর ইনজুরির কারণে তাঁর শরীর আর আগের মতো সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে না।
অবসর ঘোষণার সময় অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে স্বপ্না বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে স্লিপ ডিস্ক এবং হাঁটুর ইনজুরি সহ নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। ব্যথার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি, কিন্তু এখন আর শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “এটি আমার জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত। অ্যাথলেটিক্স আমার কাছে শুধু একটা খেলা ছিল না—এটি আমার পরিচয়, আমার আবেগ, আমার স্বপ্ন।”
এক নজরে স্বপ্নার বর্ণাঢ্য কেরিয়ার ও অদম্য সংগ্রাম:
- জন্ম ও কঠিন সংগ্রাম: ১৯৯৬ সালের ২৯ অক্টোবর উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির কাছে রাজগঞ্জ ব্লকের ঘোষপাড়া গ্রামে জন্ম হয় স্বপ্নার। তাঁর বাবা পঞ্চানন বর্মন ছিলেন ভ্যানচালক এবং মা চা বাগানের শ্রমিক। তীব্র আর্থিক অনটন এবং চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন।
- শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়: জন্মগতভাবেই তাঁর দুই পায়ে ছয়টি করে আঙুল ছিল। যার কারণে বিশেষ মাপের বা কাস্টমাইজড জুতো ছাড়া দৌড়াতে বা হেপ্ট্যাথলিটের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল। এই প্রতিকূলতাকে জয় করেই তিনি ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে নেমেছিলেন।
- ঐতিহাসিক সাফল্য: ২০১৭ সালে ভুবনেশ্বরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে জাতীয় স্তরে বড় নজরে আসেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে মুখে ও চোয়ালে গুরুতর চোট পাওয়া সত্ত্বেও হার না মানা জেদ নিয়ে লড়ে দেশের হয়ে হেপ্ট্যাথলিসে প্রথম সোনা জিতে ইতিহাস গড়েন। ওই টুর্নামেন্টে তাঁর ব্যক্তিগত সেরা স্কোর ছিল ৬০২৬ পয়েন্ট।
- জাতীয় সম্মান: তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া সম্মান ‘অর্জুন পুরস্কার’ (Arjuna Award)-এ ভূষিত করে।
- পরবর্তী পদকসমূহ: জাকার্তার ঐতিহাসিক সাফল্যের পর ২০১৯ এবং ২০২৩ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রূপো এবং ২০২৩ সালের এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে পেন্টাথলনে রূপোর পদক অর্জন করেন তিনি।
- শেষ প্রতিযোগিতা: ২০২৫ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ওপেন অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জয়ই ছিল তাঁর প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়াজীবনের শেষ পারফরম্যান্স।
নিজের দীর্ঘ কেরিয়ারের ইতি টেনে আক্ষেপের সুরে স্বপ্না আরও বলেন, “যে জিনিসকে সারা জীবন ভালোবেসেছি, আজ তা থেকে সরে দাঁড়ানো মোটেও সহজ নয়। আমার মন এখনও প্রতিযোগিতার ময়দানে নামতে চায়, লাফাতে চায় এবং নতুন স্বপ্নের পিছনে ছুটতে চায়, তবে আমাকে বাস্তবটাকে মেনে নিতেই হচ্ছে যে আমার জীবনের এই সোনালী অধ্যায়টি আজ সমাপ্তির পথে।” উত্তরবঙ্গের তথা দেশের এই কৃতি কন্যার অবসরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় ক্রীড়ামহলে।

