প্রিয়দর্শিনী বিশ্বাস, শিলিগুড়ি: একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন? খুবই চেনা সংলাপ। সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’–এ একটু জলের খোঁজে সেই নাটকের পথিক চরিত্রকে যে কতটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল তা আমাদের সবারই জানা। নাটকটির প্রতিটি সংলাপ আমাদের খুব হাসিয়েছে (Stray Animals Water Disaster)। কিন্তু সেভাবে ভাবিয়েছে কি? বিশেষ করে জলের খোঁজে মনুষ্যেতরদের ভোগান্তি যে কতটা হয় সেই খোঁজ কি আমরা রাখি? নইলে সামান্য গলা ভেজাতে ওদের আকুলিবিকুলি দেখেও আমাদের কোনও ভাবান্তর নেই কেন কে জানে।
মঙ্গলবারের দুপুর। আকাশ থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছিল। দহন দাপটে পথচলতি মানুষ জল বা ওআরএস কিনতে ব্যস্ত। আর ওরা? রাস্তাঘাটে জলের দেখা নেই। গলা শুকিয়ে কাঠ। শহরের বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে দেখা গেল কোথাও এক ফোঁটা জলের আশায় ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত গোরু আবার কোথাও একটুখানি ছায়ার খোঁজে জিভ বের করে হাঁসফাঁস করছে পথকুকুর। বাড়ির ব্যালকনিতে পাখিদের জন্য জলের পাত্র চোখে পড়লেও রাস্তায় বড় প্রাণীগুলোর পরিস্থিতি শোচনীয়। কোথাও কোথাও কৃত্রিম জলাধার থাকলেও সেগুলির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ কিন্তু মোটেই হয় না।
মিলনপল্লিতে গিয়ে দেখা গেল এক পথকুকুর লম্বা জিভ বের করে হাঁফাতে হাঁফাতে চলেছে। কয়েক পা জোরে হেঁটেই থেমে পড়ছে। অবশেষে রাস্তা পার করে একটি বাড়ির জানলার শেডের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়ে ‘স্বস্তি’। সেটাই যেন ‘সাত রাজার ধন’। কিন্তু সুখ ভাগ্যে সইলে তো! বাড়িমালিক বাইক নিয়ে বেরোবেন। অতএব, ‘হ্যাট, হ্যাট’– অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্থানত্যাগ। হিলকার্ট রোডে এক কুকুরকে অলসভাবে রাস্তায় চলতে দেখা গেল। গরম যেন শরীরের শেষ শক্তিটুকুও নিংড়ে নিয়েছে। পাশেই এক গলিতে এক বাড়ির গ্যারাজ খোলা থাকায় অনাহূত অতিথির মতো সেটি সেখানে সেঁধিয়ে গেল। জলেশ্বরীতে আরেক কুকুরকে প্রাণপণে মাটি খঁুড়তে দেখা গেল। তপ্ত মাটি সরিয়ে নীচে একটু ঠান্ডা মাটি মিলতেই তাতে খানিক গড়াগড়ি। হায়দরপাড়ার এক মহিলা এক গোরুকে আলু খেতে দিয়েছিলেন। ভ্যাপসা গরমে মুখে কি আর আলু রোচে? অতএব সটান মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। মহিলা ঘর থেকে বোতলে করে জল নিয়ে এসে সেই গোরুর মুখে ঢালার পর মানভঞ্জন। হাকিমপাড়ায় একটি বাড়ির সামনে জলের জন্য ইট গেঁথে উঁচু জায়গা করে রাখা। সামনে লেখা, ‘তৃষ্ণার্ত পশু ও পাখির জলের স্থান’। যদিও অনেকদিন ধরেই সেখানে এক ফোঁটাও জল রাখা হয় না। বাড়ির দরজায় তালা। এই রাস্তাতেই গাছের ছায়ায় বসে এক মহিলা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেই জানা গেল ইট গেঁথে তৈরি ওই জলের জায়গায় কেউ এখন আর জল রাখে না। নিজেও রাখেননি। তবে এক বাক্যে বিষয়টি স্বীকার করে বললেন, ‘এখানে জল রাখাটা সত্যিই উচিত ছিল।’
পশু চিকিৎসক নবার্ক চন্দ সতর্ক করছেন, ‘গরমে ওদের হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এ থেকে ওদের কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হতে পারে। অতিরিক্ত গরমে বমি, ডায়ারিয়া শুরু হয়ে যায়। মাল্টি–অর্গান ড্যামেজ হতে পারে। ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা শুরু না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই সময় জল এবং ছায়ার ব্যবস্থা করে দেওয়াটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ তাতে কাজ না হলে তিনি উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।
অবোলা প্রাণীদের কষ্ট দূর করতে ভারতের বেঙ্গালুরু, পুনে কিংবা ইন্দোরের মতো শহরে দারুণ ব্যবস্থা দেখা যায়। সেখানে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও পুরসভার উদ্যোগে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবোলা পশুদের জন্য ‘ওয়াটার বোল প্রোজেক্ট’ বা জলের পাত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তুরস্কের ইস্তানবুল শহরে রাস্তার কুকুর-বিড়ালের জন্য স্বয়ংক্রিয় ‘স্মার্ট রিসাইক্লিং বিন’ বসানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ সেখানে খালি প্লাস্টিকের বোতল ফেললে নীচে থাকা পাত্রে অবোলা প্রাণীদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জল ও খাবার চলে আসে। গ্রিস বা নেদারল্যান্ডসেও গ্রীষ্মকালে রাস্তার প্রাণীদের জল দেওয়া আইনি ও সামাজিক কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়।
শিলিগুড়িতেও এমন মানবিক উদ্যোগের বড়ই প্রয়োজন। তবে শহরে ব্যতিক্রমী ছবি আছে বৈকি! ছলছল চোখে হাঁটতে হাঁটতে এক গোরু এসএফ রোডের একপাশে চলে এসেছিল। সেখানে সিমেন্ট দিয়ে গাঁথনি তুলে উঁচু করে একটি জায়গা করা হয়েছে। পথচলতি চারপেয়েদের জন্য সেখানে জলের বন্দোবস্ত রয়েছে। অবোলা প্রাণীটি সেখানে বেশ কিছু সময় ধরে অল্প অল্প করে জল খেল। খানিক বাদে একটি ষাঁড়ও সেখানে এসে হাজির। জল খেয়ে বন্ধ দোকানের ছায়ায় গিয়ে দুটিতে খানিক জিরোল। এসএফ রোডের ব্যবসায়ী অর্জুন কামতি বলছিলেন, ‘দোকানের পাশেই এই প্রাণীগুলোর জল খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারাবছরই এখানে জলের বন্দোবস্ত থাকে।’ উড়ে আসা পাখিদের জন্য ঘোগোমালিতে বাড়ির ব্যালকনিতে তিথি রায় জলের পাত্র রাখেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা যদি নিজেরাই ওদের জন্য একটু ভাবি তাহলে হয়তো ওদের সমস্যা একটু হলেও মিটতে পারে।’ অর্জুন, তিথিদের মতো মানুষরা থাকলে সুকুমার রায়ের নাটকের সংলাপ হয়তো অন্যভাবে লেখা হত।
