সোমনাথ দত্ত, মালবাজার: ওদলাবাড়ির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অপরূপ ক্যানভাস। একদিকে বিস্তীর্ণ চালতাবন, আর তার বুক চিরে বয়ে চলা নদী ও দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের গম্ভীর অথচ স্নেহময় আলিঙ্গন। এই চালতাবন (Chaltaban) যেন প্রকৃতির এক নিজস্ব রূপকথার জগৎ। বন্যপ্রাণীদের নিশ্চিন্ত পদচারণা আর পাখিদের বিরামহীন কলকাকলিতে সারাদিন এখানে এক মায়াবী সুর বাজতে থাকে। চারদিকে সবুজের এক সুবিশাল সমারোহ, যা শহুরে কোলাহল থেকে আসা ক্লান্ত ভ্রমণপিপাসুদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। আর গ্রীষ্মকাল এলে তো কথাই নেই! সবুজ অরণ্যের মাঝে বেগুনি জারুল ফুলগুলো যখন থোকায় থোকায় ফুটে ওঠে, তখন পুরো বনভূমি যেন এক মায়াবী রূপকথার দেশের মতো সেজে ওঠে। নদীর জলের কুলকুল শব্দ আর জারুলের এই অপূর্ব যুগলবন্দি কালিম্পং বন বিভাগের অন্তর্গত এই চালতাবনের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই শান্ত অরণ্যে ইদানীং নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছিল। প্রকৃতির এই নিজস্ব ছন্দে তাল কাটছিল ছবি শিকারিদের দাপাদাপি। চালতাবনের এই আকর্ষণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঢুকে পড়ছিলেন অনেকেই। বনকর্মীদের নজর এড়িয়ে কেউ সেখানে পৌঁছে যাচ্ছিলেন রিলস বানানোর নেশায়, কেউ আবার মোবাইলে সেলফি বন্দি করার আশায়। সামাজিক মাধ্যমে চালতাবনের রিলসের এখন ছড়াছড়ি।
চালতাবনের এই নিভৃত পথ আসলে হাতির দলের যাতায়াতের রাস্তা। বন্যপ্রাণীদের নিরুপদ্রব জীবনযাত্রা ও সুরক্ষার কথা ভেবেই বন দপ্তরের তরফ থেকে এখানে ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা বোর্ড টাঙানো হয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সামাজিক মাধ্যমের এক আজব মোহে আচ্ছন্ন হয়ে, কিছু মানুষ লুকিয়ে ঢুকে পড়ছিলেন এই সংরক্ষিত অরণ্যের অন্দরে। উদ্দেশ্য একটাই, কয়েক সেকেন্ডের একটি ‘রিলস’ বানানো বা একটি নিখুঁত ‘সেলফি’ বন্দি করা।
তবে যে পথে চালতাবনে পা রাখতে হয়, সেখানে কিন্তু পদে পদে বিপদ। কালভার্টের নীচ দিয়ে অনেকেই বাইক, এমনকি ছোট গাড়ি নিয়েও ঢুকে পড়ছিলেন সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। কিছুদিন আগে এখানে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে গিয়ে বিপদে পড়তে হয়েছিল একটি পরিবারকে। বেশ কিছুক্ষণ তাঁদের গাড়ি আটকে ছিল। পাহাড়ি নদীতে যে কোনও সময়ে হড়পার আশঙ্কাও থাকে। ফলে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল প্রকৃতিপ্রেমী ও বনকর্মীদের কপালে। পরিবেশপ্রেমী স্বরূপ মিত্র গভীর আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, চালতাবনের এই সম্মোহনী রূপ সবাইকে কাছে টানলেও, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের সকলকেই নিতে হবে। একই সুর শোনা যায় নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটির অন্যতম কর্মকর্তা নফসর আলির গলাতেও। তাঁর মত, প্রকৃতি নিজের ছন্দে সুরক্ষিত থাকলে তবেই মানুষের অস্তিত্ব টিকবে। শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমে ক্ষণিকের জনপ্রিয়তার জন্য বা ট্রেন্ডিং হওয়ার নেশায় প্রকৃতির নিজস্ব আঙিনায় এই অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
অবশেষে বন্যপ্রাণীদের এই শান্তিনিকেতন বাঁচাতে কড়া হাতে হাল ধরেছে বন দপ্তর। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মানুষের এই অনধিকার প্রবেশ পুরোপুরি রুখতে এখন সেখানে তৈরি হয়েছে বনকর্মীদের এক বিশেষ নজরদারি দল। তাঁরা দিনরাত এক করে জঙ্গলের আনাচে-কানাচে কড়া পাহারা দিচ্ছেন। বন দপ্তরের আধিকারিকরা কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্দেশিকা অমান্য করে কেউ যদি জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করেন বা পিকনিক করার চেষ্টা করেন, তবে আইন অনুযায়ী কড়া জরিমানা করা হবে।
এই কড়া নজরদারির ফলে আপাতত চালতাবনে অবৈধ প্রবেশ অনেকটাই বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করছে বন দপ্তর। জঙ্গল আবার ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে তার পুরোনো নিস্তব্ধতা ও পবিত্রতা। হাতির দলও হয়তো আবার নির্ভয়ে পার হচ্ছে তাদের পুরোনো চেনা পথ। তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনধিকার প্রবেশ বন্ধ কতটা হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।
