পেটের বাড়তি মেদ বা ভুঁড়ি নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। চিকিৎসকেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, এই অতিরিক্ত মেদ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ফ্যাটি লিভারের মতো নানা অসুখের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা আরও এক নতুন আশঙ্কার কথা সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমরের চারপাশে জমা অতিরিক্ত মেদ শুধু শরীরের বিপাকক্রিয়াকেই নয়, ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতার উপরও।
আরও পড়ুন:
ইমিউন নেটওয়ার্ক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্ত্র কেবল হজমের অঙ্গ নয়, এটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। অন্ত্রে থাকা কোটি কোটি উপকারী অণুজীব বা গাট মাইক্রোবায়োম শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পাশাপাশি মস্তিষ্কের সুস্থতাও বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়তে পারে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর।
আরও পড়ুন:

সব পেটের মেদ এক নয়
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেটের মেদ মূলত দু-ধরনের। একটি সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট, যা ত্বকের ঠিক নিচে জমে। অন্যটি ভিসেরাল ফ্যাট, যা লিভার, অগ্ন্যাশয়, অন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির চারপাশে জমা হয়।
এই ভিসেরাল ফ্যাটই সবচেয়ে উদ্বেগের। কারণ এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর চর্বি, যা শরীরে ক্রমাগত প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক নিঃসরণ করে। এর ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়, রক্তনালির ক্ষতি হয় এবং মস্তিষ্কেও পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কেন মস্তিষ্কেরও ক্ষতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রদাহ চলতে থাকলে মস্তিষ্কের কোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে কমে যেতে পারে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ। ফলে ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে—
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
- মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
- চিন্তাভাবনার গতি ধীর হয়ে যাওয়া
- নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হ্রাস
- বয়সের তুলনায় দ্রুত জ্ঞানীয় ক্ষমতা কমে যাওয়া
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে যাঁদের কোমরের মাপ বেশি বা ভুঁড়ি থাকে, তাঁদের পরবর্তী জীবনে আলঝাইমার্স ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।

ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কেন বাড়ে?
অতিরিক্ত ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে একাধিক ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটায়। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ক্ষুদ্র রক্তনালির ক্ষতি করে। এসব কারণ মিলেই মস্তিষ্কের বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করে এবং স্নায়ুর অবক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও পড়ে প্রভাব
পেটের অতিরিক্ত মেদ শুধু স্মৃতিশক্তিরই ক্ষতি করে না। গবেষণায় দেখা গেছে, এর সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, সারাক্ষণ ক্লান্তি এবং শক্তির ঘাটতিরও সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসেরাল ফ্যাট থেকে নিঃসৃত প্রদাহ উপাদান সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এই দুই রাসায়নিকই আমাদের মেজাজ, আবেগ এবং মানসিক সুস্থতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন
- নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খান
- চিনিযুক্ত পানীয় বেশি পান করেন
- শরীরচর্চা করেন না
- পর্যাপ্ত ঘুম হয় না
- দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকেন
- ধূমপান বা অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস থাকে
- বয়স বাড়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকের ওজন স্বাভাবিক হলেও পেটের অতিরিক্ত ভিসেরাল ফ্যাট জমে থাকতে পারে। তাই শুধু বিএমআই নয়, কোমরের মাপও সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্য সূচক।

কীভাবে বুঝবেন ঝুঁকি বাড়ছে?
ভিসেরাল ফ্যাট চোখে দেখা যায় না। তবে কিছু লক্ষণ সতর্কবার্তা হতে পারে—
- কোমরের মাপ বেড়ে যাওয়া
- পেটের মেদ সহজে না কমা
- রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি
- উচ্চ রক্তচাপ
- ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া
- ফ্যাটি লিভারের সমস্যা
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে কোমরের মাপ, বিএমআই, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের পরীক্ষা করানো উচিত।
কীভাবে কমাবেন ভিসেরাল ফ্যাট?
এই চর্বি কমানো সম্ভব। নিয়মিত জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলেই এর পরিমাণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শরীরচর্চা করুন। হাঁটা, দৌড়, সাইকেল চালানো বা সাঁতারের পাশাপাশি ভারি কোনও ব্যায়ামও উপকারী।
খাদ্যতালিকায় বেশি রাখুন ফল, শাকসবজি, দানা শস্য, ডাল, মাছ, কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি। কমিয়ে দিন চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার।
প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন। পাশাপাশি মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত মেডিটেশন, যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং কোমরের মাপ পরীক্ষা করলে ঝুঁকি অনেকটাই আগে থেকে ধরা সম্ভব।
পেটের মেদকে কখনওই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা বলে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ভিসেরাল ফ্যাট নীরবে এমন সব পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যার প্রভাব একদিন পৌঁছে যেতে পারে হার্ট থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত।
তাই সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচতে চাইলে শুধু ওজন নয়, কোমরের মাপের দিকেও নজর দিন। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হতে পারে সুস্থ মস্তিষ্ককের চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
