পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প (Silk business disaster) এখন সরকারি চরম উদাসীনতায় ধুঁকছে। জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) ও আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলাজুড়ে বিস্তৃত সরকারি রেশম খামারগুলির প্রশাসনিক কঙ্কালসার চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব, দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বকেয়া বেতন এবং জমি হস্তান্তরের প্রশাসনিক চক্রান্তে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বাম আমলের শেষ পর্ব থেকে শুরু করে গত ১৫ বছরের তৃণমূল রাজত্বে রেশম চাষকে পুনরুজ্জীবিত করার বিন্দুমাত্র মানসিকতা দেখায়নি রাজ্য সরকার। উলটে এখন নজর পড়েছে খামারের কোটি কোটি টাকার ফাঁকা জমির ওপর। রেশমের উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে সেই জমি শিল্পনগরী ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পে রূপান্তরের চক্রান্ত জোরকদমে শুরু হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় রেশম খামারটি রয়েছে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকে। প্রায় ১২৭ একরের সুবিশাল জমি পরিবেষ্টিত এই খামারের সামান্য অংশে বর্তমানে মুগা ও এরি চাষ কোনওমতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পুরো খামার সচল রাখতে ভরসা মাত্র ৪৩ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী। অভিযোগ, দৈনিক ৩৩৪ টাকা মজুরির বিনিময়ে টানা ২৫ দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও গত এপ্রিল মাস থেকে চলতি অগাস্টের ৪ তারিখ পর্যন্ত তাঁদের ঝুলিতে ঢোকেনি একটি কানাকড়িও। রাজগঞ্জ খামারের চরম ক্ষুব্ধ কর্মী শুভাশিস সাহার সাফ কথা, ‘গত ১৫ বছরে আমাদের রেশম খামারের কোনও উন্নতি করেনি তৃণমূল সরকার। আমাদের বেতন ৫ মাস ধরে পাচ্ছি না। তাও কাজ করে চলেছি। এইভাবে কতদিন চলবে জানা নেই।’
এদিকে, খামারের জমি দখলের নেপথ্যে প্রশাসনিক তৎপরতাও তুঙ্গে উঠেছে। জলপাইগুড়ির আমবাড়ি ফালাকাটায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের স্বার্থে শিল্পনগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে রাজ্য শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর। নজর পড়েছে আমবাড়ির রেশম খামারের শতাধিক একর জমির ওপর। সম্প্রতি রেশম অধিকর্তার দপ্তর ও শিল্প বাণিজ্য দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা যৌথভাবে আমবাড়ির এই খামারটি ঘুরে দেখেন। শিল্প বিকাশের অজুহাতে ওই জমি লিখিতভাবে দাবি করা হয়েছে রেশম অধিকর্তার কাছে।
অন্যদিকে, ডুয়ার্সের নাগরাকাটার খুনিয়াবস্তি ও চালসার রেশম খামারগুলি আজ কার্যত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মাত্র একজন কর্মীর কাঁধে দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত প্রশাসন। সঠিক তদারকির অভাবে খামারগুলিতে ছেয়ে গিয়েছে ঘন ঝোপজঙ্গল। আলিপুরদুয়ারের চিত্রটাও পৃথক নয়। বীরপাড়া ঝিলের ১৬ একর জমির রেশম খামার কর্মীর অভাবে বন্ধ হওয়ার মুখে। শামুকতলার পুখুরিয়ার ৫ একর ও কুমারগ্রামের এন্ডিবাড়ির ১০ একর জমিতে উৎপাদন চাঙ্গা করার কোনও সরকারি সদিচ্ছা নেই। উলটে বীরপাড়া ঝিলের জমি মেডিকেল কলেজ তৈরির জন্য পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্তারা থেকে শুরু করে স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদ।
বিতর্কের মুখে জমি স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্তকে যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করেছেন জলপাইগুড়ির বিজেপি সাংসদ জয়ন্ত রায়। তিনি বলেন, ‘কোনও সরকারি খামারে ফাঁকা জমি পড়ে থাকলে সেই জমিতে অন্য সরকারি পরিকল্পনা করা যেতেই পারে। তবে বর্তমান যে প্রকল্প চলছে তার কোনও ক্ষতি না করেই।’
রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও জমি হাতবদলের খবরের মাঝে রেশম ডিরেক্টরেটের জলপাইগুড়ি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সহকারী অধিকর্তা মানব ভৌমিকের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘আমি সবেমাত্র অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব নিয়েছি। তবে সরকারিভাবে কোথায় কী প্রকল্প হবে সেটা রাজ্য সরকারের পলিসির বিষয়। আমবাড়ি ফালাকাটার খামারের জমি যৌথভাবে পরিদর্শন করা হয়েছিল।’ সব মিলিয়ে, রেশম শিল্পকে বাঁচানোর চেয়ে খামারের জমি বিক্রি রাজ্য নীতিতে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।

