নয়াদিল্লি ও শিলিগুড়ি: সরকারি প্রকল্পের চেনা ছবি মানেই লাল ফিতের ফাঁস আর দীর্ঘসূত্রতা। কিন্তু এবার সেই ট্র্যাডিশন ভাঙতে চাইছে কেন্দ্র। লক্ষ্য যখন ‘বুলেট ট্রেন’, তখন কাজের গতিও হতে হবে বুলেটের মতোই ক্ষিপ্র। দেশের অন্য ছয়টি হাইস্পিড রেলওয়ে করিডরের (Excessive Pace Rail Hall) সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার শিলিগুড়ি-বারাণসী করিডরের কাজও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করতে চলেছে রেলমন্ত্রক (Siliguri-Varanasi Bullet Prepare)। সোমবার রেল বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের নির্যাস অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জলকিশোর শর্মা বলছেন, ‘ভবিষ্যতে এই করিডর গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অসম সহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটনে জোয়ার আসবে।’
চলতি বছরেই মুম্বই-আহমেদাবাদ হাইস্পিড করিডরের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু রেলমন্ত্রক চাইছে, একটি প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা না করে সমান্তরালভাবে বাকি করিডরগুলির কাজও শুরু করে দিতে। এদিনের বৈঠকে ন্যাশনাল হাইস্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেডকে (এনএইচএসআরসিএল) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অবিলম্বে ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট (ডিপিআর) পুনর্বিবেচনা করে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। রেলের এই আগ্রাসী মনোভাবে আশায় বুক বাঁধছে উত্তরবঙ্গ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক ও পর্যটন মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে।
বাজেট পেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণো জানিয়েছিলেন, সাতটি নতুন করিডরের জন্য প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম শিলিগুড়ি-বারাণসী রুট। এটিই হতে চলেছে বাংলার প্রথম বুলেট ট্রেন রুট। এদিনের বৈঠকে এনএইচএসআরসিএল এবং ভারত আর্থমুভার লিমিটেডের শীর্ষকর্তাদের উপস্থিতিতে করিডরগুলির টেকনিকাল ও অপারেশনাল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রতিটি করিডরের জন্য আলাদা ‘কোর গ্রুপ’ তৈরি করা হবে।
প্রায় ৭১১ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি-বারাণসী করিডর চালু হলে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে। বৈষ্ণোর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দিল্লি থেকে বারাণসী পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৩ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। অন্যদিকে, পাটনা হয়ে বারাণসী থেকে শিলিগুড়ির যাত্রা সম্পন্ন হবে প্রায় ২ ঘণ্টা ৫৫ মিনিটে। তাঁর কথায়, ‘দিল্লি থেকে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডর তৈরি হবে। যা এই অঞ্চলের জন্য উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’
স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে উচ্ছ্বসিত উত্তরবঙ্গের পর্যটন মহল। পাহাড় ও ডুয়ার্সকেন্দ্রিক পর্যটনে বড়সড়ো বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাজ, আইটিসি, লেমন ট্রি-র মতো নামী হোটেল গোষ্ঠী শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় বিনিয়োগ করেছে। বুলেট ট্রেনের চাকা গড়ালে আরও বড় লগ্নি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী অভিজিৎ সেনগুপ্তর কথায়, ‘বুলেট ট্রেন চালু হলে স্টেট বর্ডার ট্যুরিজম নতুন দিশা পাবে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে অনুসারী শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।’
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, রেল যোগাযোগ আধুনিক হলে তার প্রভাব পড়বে সড়কপথেও। কেন্দ্র ও রাজ্য- উভয় সরকারই তখন এই অঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে। সব মিলিয়ে, এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় উত্তরবঙ্গ।
