মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: বৃষ্টি হলেই বন্দি হয়ে পড়েন ভুটান সীমান্তের ঢেকলাপাড়া ও বান্দাপানি চা বাগান সহ বন লাগোয়া মহল্লাগুলির প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ (Birpara)। কারণ বীরপাড়ার নাংডালা এবং জয়বীরপাড়া চা বাগানের মাঝবরাবর প্রবাহিত ডিমডিমা নদীতে সেতু নেই। শুক্রবারও নদী পেরোতে গিয়ে ব্যাপক সমস্যায় পড়েন স্থানীয়রা। জল ভেঙে বাইকে চলাচল করতে দেখা গিয়েছে অনেককেই। বাসের ছাদে চেপে ঝুঁকি নিয়ে নদী পেরিয়ে স্কুলে যায় পড়ুয়ারা।
ডিমডিমা নদীতে সেতু তৈরি নিয়ে তৃণমূল বিজেপির মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপানউতোর চলছে। অবশ্য শুক্রবার আশার কথা শুনিয়েছেন মাদারিহাটের বিধায়ক জয়প্রকাশ টোপ্পো। তিনি বলেন, ‘পূর্ত দপ্তর ওই নদীতে সেতু তৈরির চিন্তাভাবনা করছে। বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত সেতুর জায়গা মাপজোখ করেছেন পূর্ত দপ্তরের বাস্তুকাররা।’
২০১৯ সালে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ হওয়ার পর জন বারলা বান্দাপানি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাটি দত্তক নেন। ডিমডিমা নদীর ওপর সেতু তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেন। প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হন বারলা। মেয়াদ শেষের মুখে তিনি চিরাচরিত সুরে অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দিতে রাজি হলেও রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন সহযোগিতা করেনি। তাই সেতু তৈরি করা যায়নি। প্রশাসনের অসহযোগিতার পেছনে তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি। গত বছর লোকসভা ভোটে বারলাকে প্রার্থীর টিকিটই দেয়নি বিজেপি। এবছর তিনি তৃণমূলে ভেড়েন। অথচ সেতু জোটেনি তাঁর একসময়ের দত্তক নেওয়া এলাকায়।
ডিমডিমা নদীতে বছরের বেশিরভাগ সময় জল থাকে না। কিন্তু ভুটানে বৃষ্টি হলেই ওই নদীতে হড়পা হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢেকলাপাড়ার বাসিন্দা মণিকুমার ছেত্রীর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়া নউরত ছেত্রী প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রবল বৃষ্টিতে সেদিন সেতুবিহীন ডিমডিমা ছিল উত্তাল। নদী পেরোতে পারেনি গাড়ি। নদীর পাড়েই গাড়িতে মৃত্যু হয় নউরতের। সেতু তৈরি করা না হলেও বছর চারেক আগে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা প্রকল্পের ১৫ কোটি ৭১ লক্ষ টাকায় ডিমডিমা থেকে বান্দাপানি পর্যন্ত রাস্তা তৈরির সময় ডিমডিমা নদীতে কজওয়ে তৈরি করা হয়। তবে প্রতি বর্ষায় কজওয়েটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জয়বীরপাড়া চা বাগানের মিঠুন রাউতিয়া বলেন, ‘আজ সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী নিয়ে বীরপাড়া হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ওই সময় নদীতে জল ছিল না। কিন্তু ফেরার সময় দেখি তীব্র বেগে জল বইছে। প্রতি বছর নেতারা নদীর ছবি তোলেন। সেতু তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন।’
গত বছর হড়পায় নদী পেরোতে গিয়ে কয়েকজন স্কুল ছাত্রী ভেসে যাচ্ছিল। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন। ওই সময় সেতু তৈরিতে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ রমেশ ওরাওঁ। তবে আর বিষয়টি এগোয়নি।
এদিকে গত বছর উপনির্বাচনে প্রথমবার মাদারিহাট বিধানসভা দখল করে তৃণমূল। উপনির্বাচনের প্রচারে জয়বীরপাড়ায় সেতু তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন তৃণমূল প্রার্থী জয়প্রকাশ। শুক্রবার তিনি জানান, ভোটের ফল প্রকাশের পর বিষয়টি তিনি বিধানসভায় তুলেছিলেন। এরপর পূর্তমন্ত্রী পুলক রায়ের কাছে ব্যক্তিগতভাবে দরবার করেন। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘সম্ভবত পূর্তমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। কারণ বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বাস্তুকাররা এসেছিলেন। তবে বিষয়টি এখনও পর্যন্ত সমীক্ষার স্তরেই রয়েছে। তবে সেখানে সেতু তৈরি হবে বলে আমি আশাবাদী। এতে প্রায় কুড়ি হাজার মানুষের সমস্যা মিটবে।’
