সায়ন চট্টোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি: কাচের ঘেরাটোপের ওপারে রাখা পুরোনো একটি যন্ত্র। পাশে বিক্ষিপ্ত তারের জটলা। সময়ের সঙ্গে রং চটেছে। কিন্তু গৌরব? এখনও অটুট। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে বাংলার বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জাপান আর্মির সাবমেরিনে এসেছিল এই রেডিও ট্রান্সমিটার। প্রেরক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose)। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের নজর এড়িয়ে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। ইতিহাসের সাক্ষী এই যন্ত্র দেখে যেন চোখ থমকে যাচ্ছে সকলের। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার পাঠের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিপ্লবের জলজ্যান্ত ইতিহাসও তুলে ধরেছে রাজ্য পুলিশ। শিলিগুড়ি সংলগ্ন কাওয়াখালি মাঠে আয়োজিত ন্যায় সংহিতা প্রদর্শনী (Siliguri Nyaya Sanhita Exhibition) যেন বইয়ের পাতার বাইরে ইতিহাসের দলিল তুলে ধরেছে ছাত্রছাত্রী থেকে সাধারণ মানুষের সামনে।
প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা আধিকারিকরা যখন এই শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস শোনাচ্ছেন, তন্ময় হয়ে শুনছে উপস্থিত পড়ুয়ারা। সেবার ১৯৪৪ সাল। নেতাজি জার্মানিতে। সুদূরে বসে বাংলার বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রেডিও ট্রান্সমিটার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল ডঃ পবিত্রমোহন রায় এবং অমিত সিংগিলের ওপর। জার্মান সাবমেরিনে মালয়েশিয়া থেকে ওডিশা উপকূলের পুরী এবং পরে সড়কপথে কলকাতায় নিয়ে আসেন এই ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটার। সঙ্গে ছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর চার সেনা। রাজ্য পুলিশ আয়োজিত ন্যায় সংহিতা প্রদর্শনীতে ইতিহাসের সাক্ষী সেই যন্ত্র এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে দর্শকদের জন্য।
অবাক হওয়ার এখানেই শেষ নয়। ট্রান্সমিটারের ঠিক পাশেই সযত্নে রাখা নেতাজির অপ্রকাশিত আত্মজীবনীর একটি পাতা, ‘মাই ফেইথ’। সময়ের প্রলেপে পাতাটি আজ হলদেটে, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দে আজও স্পন্দিত হচ্ছে অদম্য দেশপ্রেম। একই সারিতে জ্বলজ্বল করছে মাস্টারদা সূর্য সেনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের জারি করা ‘লুকআউট নোটিশ’ এবং জেল থেকে লেখা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের আবেগঘন চিঠির প্রতিলিপি।
আরেক পাশে প্রদর্শিত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র। সেই অস্ত্রগুলিতে রয়েছে বিপ্লবীদের হাতের ছোঁয়া। রয়েছে টুয়েন্টি চেম্বার পিন রিভলভার, বড় নলযুক্ত বন্দুক এবং সিলভার মেড স্কচ র্যামসন পারকাসন টাইপ পিস্তল। পুরোনো হয়ে যাওয়া সেই অস্ত্রগুলির গায়ে লেখা রয়েছে বিপ্লবের কাহিনী। দেখে চোখ যেন ছানাবড়া পড়ুয়াদের।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ব্যাপারে জানতে এসে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে যেন নতুনভাবে জানার সুযোগ হল শিলিগুড়ি ও মহকুমার বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের। শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁদের বিস্তারিত জানালেন, কীভাবে একসময় দূরত্ব পেরিয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহৃত হত এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ে যোগাযোগের গুরুত্ব কতটা ছিল।
প্রদর্শনীতে এসে বিস্মিত এনজেপি রেলওয়ে কলোনি স্কুলের নবম শ্রেণির সুরজিৎ দাস, তনুশ্রী কুশমেট। আইনের পাঠ পড়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বীরগাথা জানার এই ব্যবস্থা দেখে তারা আপ্লুত। সুরজিৎ বলে, ‘এমন প্রদর্শনীতে এসে ইতিহাসের সাক্ষী হব, ভাবিনি। নেতাজির পাঠানো রেডিও ট্রান্সমিটারের ইতিহাস শুনে অভিনব লাগল। পাঠ্যবইয়ের বাইরে এ এক নতুন কিছু জানার সুযোগ হল।’
বাতাসি থেকে আসা সরকারি স্কুল, বিধাননগরের একটি ইংরেজিমাধ্যমের স্কুল, সারদা শিশুতীর্থের মতো বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা দীর্ঘ লাইন করে প্রদর্শনী উপভোগ করল। শিক্ষকদের গলাতেও তৃপ্তির সুর। তাঁদের কথায়, শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়াল ও সিলেবাসের গণ্ডি পেরিয়ে পড়ুয়ারা চোখের সামনে যে জীবন্ত ইতিহাসকে অনুভব করল, তা তাদের কাছে চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়েই থেকে যাবে।

