রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: ভারতীয় মান নির্ণায়ক সূচকের (বিআইএস) নতুন প্রকাশিত ম্যাপে উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সকে জোন ৬ অর্থাৎ সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিখটার স্কেলে আট বা তার বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হলে পাহাড়-সমতলে বিরাট মাপের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিলিগুড়ির (Siliguri) আকাশেও আসন্ন বিপদের কালো ঘনঘটা।
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের পরামর্শ, এখন থেকেই শহরে উঁচু বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। নয়তো অদূরভবিষ্যতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শহরের আনাচে-কানাচে ছেয়ে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গলে সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন তাঁরা। প্রশাসনের কাছে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নতুন গাইডলাইন প্রকাশের দাবি তুলেছেন।
শিলিগুড়ি আগে সিসমিক জোন ৪-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে এতদিন নির্মাণের ক্ষেত্রে জোন ৪ এবং কিছুক্ষেত্রে জোন ৫-এর জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন মেনে কাজ হত। নয়া সিসমিক ম্যাপে জোন ৬ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর এই এলাকায় নির্মাণের জন্য ‘ডাকটাইল ডিটেলিং কোড’-এরও বদল আনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সিসমিক জোন ৪-এ ডাকটাইল ডিটেলিং কোড ১৩৯২০ মেনে কাজ করা হত। এখন সেই অনুযায়ী কাজ করা চলবে না বলেই স্পষ্ট করছেন ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, নতুন করে মাটির ধারণক্ষমতা মেপে কোড তৈরির প্রয়োজন।
এদিকে, পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার কৃষ্ণেন্দু পালের কথায়, ‘এখনও আমাদের কাছে সরকারি তরফে নতুন গাইডলাইন আসেনি। আমরা সিসমিক ৫ হিসেবেই কাজ করছি। পুরোনো বিল্ডিংয়ের কিছু অংশের ভূমিকম্পের মাত্রা সহনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। শহরে নতুন করে ২০তলা ভবনও নির্মাণ করা যাবে, তবে সেজন্য উন্নতমানের প্রযুক্তি দরকার।’
পুরনিগম কী ভাবছে? শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের দাবি, ‘এটা তো আমি জানি। সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের সঙ্গে কথা হচ্ছে। রাজ্য যেমন গাইডলাইন তৈরি করবে, সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করব।’
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায়, শিলিগুড়ির আশপাশেই রয়েছে তিস্তা ফল্ট জোন। হিমালয় পর্বতমালায় যে তিনটি ফল্ট জোন রয়েছে, তার একটি এটা। শিলিগুড়ি শহরের মাটি খুব একটা পাথুরে নয়। সিসমিক জোন ৪ থাকাকালীন র্যাফ্ট কিংবা আইসোলেটেড ফাউন্ডেশন করে বড় বড় বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। এবার সেই পদ্ধতিরও পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া, পুরোনো প্রতিটি বহুতল ও সেতুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী ছাড়াও দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে বিভিন্ন সরকারি পদে থাকা বাস্তুকারদের একাংশ শিলিগুড়ির ‘সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ তকমায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর অন্যতম কারণ, ব্যাংয়ের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বহুতলের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালী, সমাজবিরোধীদের মদতেই চলছে কর্মকাণ্ড। এধরনের প্রবণতা বিপদ আরও বাড়াচ্ছে।
বাস্তুকারদের পরামর্শ, বহুতল নির্মাণের আগে মাটির শক্তি পরীক্ষা কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিল্ডিংয়ের পিলার তুলতে হবে মাটির আরও গভীরতা থেকে। পিলার শক্তিশালী হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গাঁথনির ক্ষেত্রে ইটের ব্যবহার কমিয়ে আরসিসি (অর্থাৎ লোহার কাঠামো বানিয়ে কংক্রিটের ঢালাই) পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করতে হবে। পুরোনো বিল্ডিংয়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ‘জ্যাকেটিং’ করে পিলারের পরিধি বাড়িয়ে বিল্ডিংয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে বলেও মনে করেন তাঁরা।
গুজরাটের ভূজে ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভূমিকম্পের পর আইআইটি কানপুরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে শহর পুনর্গঠনের ছক তৈরি হয়েছিল। ওইসময় ভূজ সিসমিক জোন ৫-এর তালিকাভুক্ত ছিল। বর্তমানে দার্জিলিং পাহাড় ও সমতলের শিলিগুড়ি সিসমিক জোন ৬-এ রয়েছে। তাই এখানেও আইআইটি খড়্গপুর কিংবা কানপুরের বিশেষজ্ঞদের এনে সমীক্ষা চালানোর দাবি উঠছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী বর্তমানে আসানসোলে কর্মরত এক মুখ্য বাস্তুকার আগে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি বললেন, ‘আমি এই বিষয়টি সরকারকে অনেক আগেই বলেছিলাম। সিসমিক জোন ৬-এর তালিকায় আসার সম্ভাবনা প্রবল ছিল তখন থেকে। আইআইটি কানপুরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষা করানোর পরামর্শও দিয়েছি সেসময়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমস্ত বহুতলের কাজ বন্ধ রেখে সমীক্ষা চালিয়ে গাইডলাইন সহ সব নিয়মনীতি সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।’
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজির অধ্যাপক কৌশিক সাহার গলাতেও শঙ্কার সুর, ‘শিলিগুড়িতে যথেচ্ছ অবৈধ নির্মাণ চলছে। জলাভূমি বুজিয়ে বিল্ডিং উঠছে। অবিলম্বে বন্ধ করতে না পারলে সমূহ বিপদ।’ তাঁর সঙ্গে হয়তো সহমত হবেন শহরের প্রতিটি সচেতন নাগরিক।
