তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরেই বাঙালির জাতীয় উৎসব দুর্গাপুজো। পুজোমণ্ডপে প্রতিমা দেখতে গিয়ে থিম, মৃৎশিল্পীর কাজ নিয়ে আলোচনা হলেও অলংকারশিল্পীর কথা প্রায় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ অলংকার ছাড়া দেবীর সাজ অসম্পূর্ণ। এমনই একজন অলংকারশিল্পী মধ্য চয়নপাড়ার দোয়েল দাস দে। ২৩ বছর ধরে ঠাকুরের গয়না তৈরি করছেন তিনি। ইতিমধ্যে তাঁর তৈরি গয়নায় সেজেছে উপকার ক্লাব, হায়দরপাড়া স্পোর্টিং ক্লাব, সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন, সুকান্তনগর ক্লাব সহ প্রতিমা। চলতি বছর চম্পাসারির জাতীয় শক্তি সংঘ ও পাঠাগার ক্লাবের প্রতিমার অলংকার তৈরির দায়িত্বও তাঁর। আরও কয়েকটি প্রতিমার গয়না তৈরি হচ্ছে তাঁর হাতে।
পুজোর প্রায় তিন মাস আগে থেকেই রাতের ঘুম উড়ে যায় দোয়েলের। মৃৎশিল্পীদের কাছ থেকে একের পর এক গয়নার অর্ডার আসতে থাকে। শিলিগুড়ির (Siliguri) কুমোরটুলিতে তাঁর তৈরি অলংকারে সেজে ওঠে বহু প্রতিমা। শুধু দুর্গা নয়, কালী, মনসা, গণেশ, বিশ্বকর্মা এমনকি শনিঠাকুরও সেজেছে তাঁর তৈরি গয়নায়। দোয়েলের কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই ক্যাফ্টের জিনিস করতে ভালো লাগত। তবে ২০০৩ সালে মৃৎশিল্পী সুশান্ত পাল আমাকে প্রথম ঠাকুরের অলংকার তৈরির প্রস্তাব দেন। প্রথমে ভয় লাগলেও আমার ক্লে দিয়ে অলংকার তৈরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সেই অলংকার তৈরি করে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে শিলিগুড়ির কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা অলংকারের জন্য যোগাযোগ করতে শুরু করেন।’ সময়ের সঙ্গে বদলেছে অলংকারের নকশা ও উপকরণ। সোলার জায়গায় এখন জরি, পুঁতি, রাংতা, শক্ত বোর্ড সহ নানা সামগ্রী ব্যবহার করেন দোয়েল। আঠা দিয়ে সেগুলি জুড়ে তৈরি করেন মুকুট, আংটি, মালা, চুড়ি, কানের দুল, টিকলি সহ নানা অলংকার। তিন মাস ধরে একাই এই কাজ করছেন তিনি।
শিলিগুড়ি শহরের বেশিরভাগ মৃৎশিল্পী কলকাতা থেকে প্রতিমার গয়না কিনে আনেন। ফলে আগে সোলা দিয়ে অলংকার তৈরি করা অনেকেই লাভ কম হওয়ায় কাজ ছেড়েছেন। হায়দরপাড়ার মৌমিতা পাল বলছিলেন, ‘একসময় মায়ের সঙ্গে ঠাকুরের অলংকার তৈরির কাজ করতাম। কিন্তু লাভ সেভাবে না হওয়ায় সাত বছর আগে তা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন সেলাইয়ের কাজ করছি।’ কুমোরটুলিতেও অনেকে বাইরে থেকে গয়না আনেন।
পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কম, স্বীকার করেন দোয়েলও। কিছুটা আক্ষেপ সুরে তাঁকে বলতে শোনা গেল,‘ সারা বছর কোনও না কোনও পুজো হয়। ঠাকুরের অলংকার বানিয়ে অনেক মহিলা স্বনির্ভর হতে পারেন। কিন্তু এব্যাপারে সেভাবে সচেতনা নেই। এখানে সুন্দর অলংকার তৈরি হলে মৃৎশিল্পীরাও বাইরে থেকে অর্ডার করবেন না। তখন লাভের মুখ বেশি দেখা যাবে।’

