রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: সন্ধে নামতেই গন্ধে ম-ম করতে থাকে শহরের বিভিন্ন এলাকা। ঢাকনা খুলতেই ধোঁয়া ওঠা মোমোর দেখা মেলে। কোথাও আবার তাওয়ায় রান্না হয় চাউমিন, পাস্তা। গরম তেল থেকে ছেঁকে তোলা হয় চপ আর কাটলেট। শিলিগুড়ির (Siliguri) স্টেশন ফিডার, হিলকার্ট থেকে সেবক রোড, বিধান মার্কেট চত্বরে ভিড় জমান খাদ্যপ্রেমীরা।
তাঁদের চোখের সামনেই তেল চিটচিটে খুন্তি, কড়াই ব্যবহার হচ্ছে রোজ। পুড়ে যাওয়া কালো তেলে রান্না হয় দিনের পর দিন। তাঁদের চোখের সামনেই ব্যবহার হতে হতে ঘোলাটে হয়ে যাওয়া গামলাভর্তি জলে ডোবানো হচ্ছে প্লেট, চামচগুলো। তবুও, হুঁশ ফেরার নাম নেই ‘ফুড লাভার’-দের। ক্রেতাদের তরফে অভিযোগ ওঠে না জন্যই উদাসীন মনোভাব দোকানিদের।
কলেজ পড়ুয়া অঙ্কিতা পালের বক্তব্য, ‘সারাদিন রাস্তাঘাটে ঘুরে ধুলোবালি তো চোখেমুখে ঢুকছে। খিদে পেলে বাইরে খেতে হয়। তাই অত ভেবে লাভ নেই। এত ভাবলে সব খাবার বাদ দিয়ে দিতে হবে।’ রাম ছেত্রীর নামে এক খদ্দেরের কথায়, ‘রাস্তার ঠ্যালাগাড়িতে সস্তার খাবার পাওয়া যায়। আমাদের মতো দিনমজুররা তো আর বড় রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেতে পারবে না। আমরা ছোট থেকে এই সমস্ত খাবার খাচ্ছি। কিচ্ছু হবে না।’
শুক্রবার বিকেলে ওই সমস্ত এলাকায় ঘুরে নজরে এল ভয়াবহ ছবি। স্টেশন ফিডার রোড, হিলকার্ট রোডে (Hill Cart Highway) ঠ্যালাগাড়িতে মোমোর দোকান চালান অনেকে। অথচ অধিকাংশ স্টলে পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা নেই। কেউ ২০ লিটারের জারবন্দি জল কিনে আনেন। কেউ আবার আশপাশের ভবন বা বাড়ি থেকে জল সংগ্রহ করেন বিভিন্ন কাজের জন্য।
একটি গামলায় জলে বাসন ধোয়ার পাউডার গোলানো থাকছে, অপর গামলাতে রাখা হচ্ছে শুধু জল। এঁটো প্লেট প্রথমে চোবানো হয় পাউডার গোলা জলে। তারপর সেখান থেকে তুলে চোবানো হয় অপরটিতে। শুধুই চুবিয়ে তোলা। ঘষামাজার কারবার নেই। ফলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুটো গামলার জলই ঘোলাটে আর নোংরা হয়ে যাচ্ছে। ওপরে ভাসছে তেলের স্তর। কোনও কোনও দোকানে সেই অপরিষ্কার জল পালটানো হয় না সারাদিনেও।
বিক্রেতাদের একাংশের সাফাই, কাছাকাছি জলের ব্যবস্থা নেই, বারবার জল বয়ে আনা কিংবা কেনা সম্ভব নয়। তাই এভাবে কাজ চালাতে হয়। একদল আবার বাসন ধোয়ার ঝামেলা এড়াতে এক অভিনব অথচ বিপজ্জনক ফন্দি এঁটেছেন। স্টিলের প্লেট হয়তো ঠিকমতো ধোয়াই হল না, তার ওপর দিয়ে দেওয়া হল একটি পাতলা কাগজের প্লেট।
এসএফ রোডে ফুড (Road Meals Hygiene) স্টল রয়েছে অনীতা সরকারের। তিনিও ২০ লিটারের জারবন্দি জল কিনে আনেন। স্টিলের প্লেটের ওপর কাগজের প্লেট রেখে খাবার পরিবেশন করেন। তাঁর দাবি, ‘আমি গ্রাহকের খাওয়া হলে কাগজের প্লেট ফেলে অন্য প্লেটটি ধুয়ে ফেলি। এতে জল কম খরচ হয়। এখানে তো জল সংগ্রহের তেমন ব্যবস্থা নেই।’ শিলিগুড়ি জংশনের কাছে ঠ্যালাগাড়িতে মোমোর দোকান করেন পুলক দাস। সহযোগী একজন। বেশ জনপ্রিয় তাঁর দোকানটি। একই পদ্ধতিতে প্লেট ধুচ্ছিলেন। পুলকের সাফাই, ‘এত জল কোথায় পাব? তবে, নোংরা খেতে দিই না।’ এসব প্রকাশ্যে হলেও দোকানে ক্রেতাদের ভিড়ে ঘাটতি নেই। তঁাদের যুক্তি, বাইরে খেতে হলে অত দেখলে চলে না।
