বয়সের কাঁটা ৬১ ছুঁয়েছে। অথচ পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দেখলে তা বোঝার উপায় নেই! কখনও খালি গায়ে পেশিবহুল শরীর নিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন, কখনও আবার অনায়াসে কঠিন স্টান্ট করছেন। ‘পাঠান’ থেকে ‘জওয়ান’, শাহরুখ খানের শরীরী রূপান্তর বারবার চমকে দিয়েছে দর্শকদের। কিন্তু এই বয়সেও এমন শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার পিছনে কী রয়েছে? জটিল কোনও ডায়েট, নাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে ঘাম ঝরানো?
বাদশার ফিটনেসের গল্পটা একটু অন্য রকম। তাঁর খাদ্যাভ্যাস যেমন বেশ সাধারণ, তেমনই শরীরচর্চার সময়ও বাঁধা গতের নয়। কখনও দিনে একবার খাবার খাওয়া, কখনও গভীর রাতে ব্যায়াম, আবার ভোর পাঁচটায় ঘুমোতে যাওয়া।
আরও পড়ুন:
২০২৪ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণত প্রায় ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করেন। তবে তাঁর এই ব্যক্তিগত রুটিনের সবটাই যে অনুসরণযোগ্য, তা নয়। বরং তাঁর দীর্ঘদিনের অনুশীলন, শরীরচর্চা এবং খাবারের পুষ্টিগুণের দিকগুলি থেকে শেখার রয়েছে অনেক কিছু।
আরও পড়ুন:

পাতে চিকেন, ব্রকোলি, স্প্রাউটস!
ফিট থাকার জন্য শাহরুখের খাবারের তালিকায় রয়েছে পরিচিত কিছু খাবার। গ্রিলড চিকেন, স্প্রাউটস, ব্রকোলি এবং অল্প ডাল তাঁর নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ। সাধারণত দুপুর বা রাতে খাবার খান তিনি। মাঝখানে টুকটাক খাবার খাওয়ার প্রবণতাও বিশেষ নেই।
তবে খাবার নিয়ে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করেন না অভিনেতা। অন্যের বাড়িতে গেলে বিরিয়ানি, রুটি, পরোটা বা লস্যি- যা পরিবেশন করা হয়, তা খেতেও আপত্তি নেই তাঁর। অর্থাৎ, প্রতিদিনের খাবারে শৃঙ্খলা থাকলেও পছন্দের খাবার একেবারে বাদ দেওয়ার পক্ষপাতী নন।
এই খাদ্যতালিকার পুষ্টিগুণও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিলড চিকেন পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রোটিন জোগায়। স্প্রাউটস থেকে মেলে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও ফাইবার। ব্রকোলিতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান। ডালও প্রোটিন, ফাইবার ও শর্করার ভালো উৎস। তবে শুধু এই কয়েকটি খাবার খেলেই এমন শরীর তৈরি হবে, তা নয়। প্রয়োজন বয়স ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী সুষম খাদ্যতালিকা।

‘পাঠান’-এর পেশিবহুল চেহারার পিছনে কোন ব্যায়াম?
বাদশার শরীরী রূপান্তরের অন্যতম বড় উদাহরণ ‘পাঠান’। এই ছবির জন্য তাঁর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। অভিনেতার প্রশিক্ষক প্রশান্ত সাওয়ান্তের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পর্বে আগের তুলনায় ভারী ওজন নিয়ে ব্যায়ামের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল।
ডেডলিফট, পুল-আপ, পায়ের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং পেটের পেশির অনুশীলন ছিল রুটিনে। আগে যেখানে সার্কিট ট্রেনিং ও কার্ডিও ব্যায়ামের দিকে বেশি মনোযোগ ছিল, সেখানে পেশির গঠন স্পষ্ট করতে যুক্ত হয়েছিল শক্তিবর্ধক প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি খাবারে প্রোটিন, শর্করা ও ফ্যাটের ভারসাম্য রাখার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছিল।
এই ধরনের ব্যায়ামের গুরুত্ব শুধু পেশিবহুল শরীর তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। বয়স বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পেশির পরিমাণ ও শক্তি কমতে থাকে। যাকে বলে সারকোপেনিয়া। নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশির ক্ষয় ধীর করতে, হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং দৈনন্দিন চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই ষাটের পরেও শরীরচর্চায় শক্তিবর্ধক ব্যায়াম রাখা জরুরি। তবে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বুঝে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে শুরু করতে হবে।
দিনে মাত্র ৩০ মিনিট!
অনেকের ধারণা, ফিট থাকতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটাতে হয়। শাহরুখের শরীরচর্চার অভ্যাস সেই ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণত প্রায় ৩০ মিনিট ব্যায়াম করেন। তাঁর প্রশিক্ষক প্রশান্ত সাওয়ান্তও জানিয়েছেন, তাঁদের প্রশিক্ষণের পর্ব প্রায় ৪৫ মিনিট পর্যন্ত চলে এবং সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন শরীরচর্চার উপর জোর দেওয়া হয়।
আসলে শরীরচর্চার ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে নিয়মিত অনুশীলন এবং ব্যায়ামের ধরন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কার্ডিও, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের সমন্বয় প্রয়োজন। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার কার্ডিও ব্যায়াম এবং দু’দিন পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভোর পাঁচটায় ঘুম!
শাহরুখের জীবনযাপনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক তাঁর ঘুমের সময়। ২০২৪ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, অনেক দিনই ভোর পাঁচটার দিকে ঘুমোতে যান। কাজ থেকে রাত দুটো নাগাদ বাড়ি ফিরে স্নান করেন, ব্যায়াম করেন, তার পর ঘুমোতে যান। শুটিং থাকলে সকাল ন’টা বা দশটার দিকে ওঠেন।
তবে এই রুটিন দেখে কম ঘুমিয়ে শরীরচর্চা করার কথা ভাববেন না। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের সময়ই শরীরের পেশি পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামতের প্রক্রিয়া চলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের কর্মক্ষমতা, মনোযোগ ও বিপাকক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে। তাই শাহরুখের ঘুমের সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত, ফিট থাকার কোনও পরীক্ষিত কৌশল নয়।
দিনে একবার খাওয়া কি সত্যিই ওজন ও পেশি নিয়ন্ত্রণে রাখে?
শাহরুখের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলোচনায় আসে দিনে একবার খাবার খাওয়ার প্রসঙ্গও। তবে তিনি যে সব সময় এই নিয়ম মেনে চলেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অভিনেতার এই ব্যক্তিগত অভ্যাসকে সকলের জন্য আদর্শ খাদ্যাভ্যাসও বলা যায় না।
দিনে কতবার খেতে হবে, তা নির্ভর করে বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যের উপর। বিশেষত বয়স বাড়লে পেশির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালরির প্রয়োজন। খাবারের পরিমাণ অতিরিক্ত কমিয়ে দিলে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই খাবারের সংখ্যা নয়, সারাদিনে কতটা পুষ্টি শরীরে পৌঁছচ্ছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বয়স ৬০ পেরলেও শরীরচর্চায় ইতি নয়
কিং খানের ফিটনেসের সবচেয়ে বড় দিক তাঁর ধারাবাহিকতা। পেশিবহুল শরীর কোনও কয়েক সপ্তাহের চ্যালেঞ্জের ফল নয়। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান, খাবারের দিকে নজর এবং শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার সম্মিলিত ফল।
ষাটের পর সুস্থ থাকতে শুধু পেশির শক্তি নয়, ভারসাম্য, নমনীয়তা ও হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতাও বজায় রাখা প্রয়োজন। তাই হাঁটা, সাইক্লিং, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলনকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা উচিত।
শাহরুখের জীবনযাপন থেকে দিনে একবার খাওয়া বা ভোর পাঁচটায় ঘুমোতে যাওয়ার অভ্যাস নকল করার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর দীর্ঘদিনের শরীরচর্চা ও নিয়মিত অনুশীলন থেকে শিক্ষা নেওয়াই ভালো। কারণ বয়স বাড়লেও শরীরের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
