Scholar Protests | ফরাসি মুলুকে শিক্ষাঙ্গনের বেহাল দশায় নামল শিক্ষক-ছাত্রের নজিরবিহীন জনস্রোত, সংঘর্ষ ও ট্রাম্পের মন্তব্যে উত্তপ্ত প্যারিস

ব্লগ/BLOG
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দফায় দফায় চলা আন্দোলনের জেরে ইউরো অঞ্চলের রাজনীতিতে এখন তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ মঙ্গলবার এক বিশাল আকার ধারণ করে। ফরাসি প্রশাসনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলিতে পরিকাঠামোর বেহাল দশা, ক্লাসরুমের সংস্কার এবং শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই মিছিলে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামে। রাজধানী প্যারিস সহ মার্সেই, স্ত্রাসবুর এবং লিলের রাজপথে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে পা মেলায় হাজার হাজার পড়ুয়া, শিক্ষক এবং অভিভাবকরা। আন্দোলনকারীদের আটকাতে পুলিশ চত্বরে কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট ও গ্রেনেড ব্যবহার করলে পরিস্থিতি দ্রুত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

এই অভ্যন্তরীণ সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বিতর্কিত বার্তা দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে অন্য মোড় দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ফ্রান্সে পড়ুয়াদের এই প্রতিবাদ আদতে শিক্ষার অধিকারের লড়াই নয়, বরং ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’ এবং ‘একটি ঐতিহ্যশালী দেশের নিয়ন্ত্রণ বা দখল নেওয়ার জন্য ইসলামের’ অপচেষ্টা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে দেওয়া এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে চরম উত্তাপ ছড়িয়েছে। যদিও ফরাসি প্রশাসন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও আন্দোলনকারী পড়ুয়া সংগঠনগুলি ট্রাম্পের এই ধর্মীয় মেরুকরণের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উস্কানিমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ফরাসি প্রতিনিধিদের বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের মূল অসন্তোষ বিদ্যালয়ের কঙ্কালসার পরিকাঠামো, শিক্ষকসঙ্কট এবং ফরাসি সরকারের বাজেট ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে ধর্মীয় অভিসন্ধির কোনও যোগ নেই।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, মঙ্গলবারের দেশজোড়া এই বিক্ষোভে মোট ২ লক্ষ ৬৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে কেবল প্যারিসেই প্রায় ৫৬ হাজার বিক্ষোভকারী পথে নেমেছিলেন। প্যারিসের ২০ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের লিসে এলেন বুশে স্কুলের পড়ুয়ারা ডাস্টবিন ও বাইসাইকেল উলটে রাস্তা আটকে অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে। মঙ্গলবার দিনভর চলা এই কর্মসূচিতে প্রায় ৫০০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত দু’সপ্তাহে এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য অন্তত ৬,৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের সিংহভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলপড়ুয়া।

আন্দোলন দমনে পুলিশের অতি-সক্রিয়তা ও মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার ফরাসি অভিভাবকদের চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গত সোমবার পুলিশের ছোড়া একটি গ্রেনেড ফেটে মারাত্মক আহত হয় ১৫ বছর বয়সি এক কিশোর। তাকে একটি হাত খোয়াতে হয়েছে। পুলিশি পীড়নের কড়া সমালোচনা করে ফ্রান্সের অতিবামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউড-এর সাংসদ অরেলিয়াঁ ল্য কক বলেন, ‘‘পুলিশ, লাঠি, রবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস— নাবালকদের ওপর এই ধরনের বর্বরতা পুরোপুরি অসহনীয়।’’ ছাত্র সংগঠনগুলির ফেডারেশনের সভানেত্রী সুজ়ান নাইডাম স্পষ্ট জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবাদ থামবে না। অন্যদিকে সরকারের দাবি, সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৭১৫ জন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন।

ফরাসি তরুণ সমাজের এই তীব্র ক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত শিক্ষাব্যবস্থা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ফ্রান্সের জাতীয় আদর্শ ‘‘স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব’’ হলেও প্রান্তিক ও দরিদ্র অঞ্চলের স্কুলগুলিতে ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই। ভাঙাচোরা বেঞ্চ ও চেয়ার, গ্রীষ্মকালে এসি বা ফ্যানের অভাবে হাঁসফাঁস অবস্থা এবং একাধিক স্কুলে ইঁদুরের চরম উপদ্রব। এর পাশাপাশি শিক্ষকসঙ্কট এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় দীর্ঘ পাঠ্যসূচির মানসিক চাপ পড়ুয়াদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। ক্ষোভ সামাল দিতে মঙ্গলবার ফ্রান্স জুড়ে প্রায় ৮৯১টি স্কুলে কোথাও আংশিক, কোথাও বা পুরোপুরি পঠনপাঠন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন। নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে ছাত্ররা যাতে তাদের অভিযোগ জানাতে পারে, তার জন্য শিক্ষা মন্ত্রক একটি অনলাইন পোর্টালও চালু করেছে।

দ্বিতীয় মেয়াদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। এই আন্দোলন তাঁর উপর চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের জেরে ফ্রান্সে হু-হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। তার ওপর দারিদ্র্য, ধনবৈষম্য এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি বাজেট ছাঁটাইয়ের ফলে সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, তা এখন এই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে মিশে এক বিশাল সামাজিক রূপ নিয়েছে। লিলের ৪৭ বছর বয়সি এক অভিভাবক লিয়া মোনিমার বলেন, ‘‘ওদের বয়স ১৭। ওরা বোকা নয়, ওরা বোঝে ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী খেলা চলছে। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে ওদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।’’

পুলিশের ভূমিকাকে সমর্থন করে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ় দাবি করেছেন, ‘‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের পদক্ষেপ সংগত। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়া ল্যকর্নু সংসদে আন্দোলনকারীদের কথা শোনার আশ্বাস দিলেও স্কুলে উগ্র হিংসার কঠোর সমালোচনা করেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা বর্ণবাদের অভিযোগকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন।

ইতিমধ্যে ফরাসি ছাত্র আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও। বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়, যেখানে অন্তত ৩০ জন পড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য যা-ই হোক না কেন, সমস্ত দমনপীড়নকে বুড়ো আঙুল দিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার ফের ফ্রান্স স্তব্ধ করার ডাক দিয়েছে আন্দোলনকারী ছাত্র সংগঠনগুলি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *