রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : পাহাড়ের মাথায় তখন মেঘের লুকোচুরি। একদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারশুভ্র শৃঙ্গ, অন্যদিকে দিগন্তজোড়া পাহাড়ের সারি। ভোরের আলোয় সান্দাকফুকে দেখে মনে হয়, পৃথিবীর যাবতীয় ক্লান্তি ভুলে থাকার এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর হয় না। সেই দৃশ্যের টানেই প্রতি বছর ছুটে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। কিন্তু ১১,৯২৯ ফুট উচ্চতার এই স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছানোর পর কারও কারও আনন্দের সফর পরিণত হচ্ছে শেষযাত্রায়। শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি, আচমকা শারীরিক অবনতি। তারপর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ। একের পর এক মৃত্যু হলেও সান্দাকফুতে পর্যটকদের জন্য জরুরি চিকিৎসার ন্যূনতম পরিকাঠামো কেন গড়ে উঠল না, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছেই।
সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি মৃত্যু এই প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করে তুলেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সান্দাকফু-ফালুট রুটে ট্রেকিং করতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয় তুফানগঞ্জের বাসিন্দা প্রিয়তোষ অধিকারীকে। দুর্গাপুজোর মধ্যেই গত ২০ অক্টোবর রাতে টুমলিংয়ের একটি হোমস্টেতে খাওয়াদাওয়ার পর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বারাসতের ৪৮ বছর বয়সি বুবাই পালের। তাঁকে ল্যান্ড রোভারে করে সুখিয়াপোখরি ব্লক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। গত তিন বছরে সান্দাকফুতে গিয়ে অন্তত ১০ জন পর্যটকের মৃত্যুর খবর রয়েছে। গত এক থেকে দেড় বছরের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান সামনে না এলেও পরপর মৃত্যুর ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সমস্যাটি কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই আর।
সেই প্রেক্ষিতেই পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ শনিবার উত্তরবঙ্গ সংবাদকে জানিয়েছেন, এবার থেকে কড়াকড়ি শুরু হচ্ছে সান্দাকফুর পথে। মানেভঞ্জন ও মেঘমায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ছাড়পত্র মিললে তবেই পর্যটকরা সান্দাকফুর পথে এগোতে পারবেন। শংকর বলছেন, ‘পুনরায় এক পর্যটকের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই বিষয়টি নিয়ে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জিটিএ) প্রশাসক এবং দার্জিলিংয়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলেছি। জিটিএ দ্রুত এই বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করবে।’
তবে এমন নির্দেশিকা কিন্তু এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস। পরপর পর্যটকের মৃত্যুতে সান্দাকফুতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার কথা জানিয়েছিল প্রশাসন। ঘোষণা হয়েছিল, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সান্দাকফু যেতে মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট দেখাতে হবে। পর্যটকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকাও প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় দু’বছর। কিন্তু সান্দাকফুতে পর্যটকের মৃত্যু থামেনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে ওই নির্দেশিকার বাস্তবায়ন নিয়ে।
সান্দাকফুর বিপদটা আসলে কোথায়? পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ভুলে যান, এই উচ্চতায় শরীরের ওপর চাপ অনেক বেশি। বাতাসে অক্সিজেনের আংশিক চাপ কমে যাওয়ায় উচ্চতাজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। শ্বাসকষ্ট থেকে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। অথচ এখন আর সান্দাকফু যেতে হলে ট্রেকিং করতেই হবে, এমন নয়। ল্যান্ড রোভারে চেপেও পৌঁছে যাওয়া যায় পাহাড়ের চূড়ায়। ফলে শারীরিক সক্ষমতা যাচাই না করেই অনেকে যাত্রা শুরু করছেন। কে কতটা সুস্থ, কার উচ্চতায় ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা এতদিন ছিল না। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি নিরাপত্তার বন্দোবস্তও।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সান্দাকফুতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বাঁচানোর মতো চিকিৎসা পরিকাঠামোই নেই। নেই পর্যাপ্ত স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নেই সর্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা। অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার অভাবে অসুস্থ পর্যটককে ল্যান্ড রোভারে চাপিয়ে নামিয়ে আনতে হয় সুখিয়াপোখরি হাসপাতালে। পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে সেই হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়। শ্বাসকষ্টের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এই দীর্ঘ সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হল, যে জায়গায় পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত, সেখানে অন্তত জরুরি অক্সিজেন, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও দ্রুত রোগী সরানোর ব্যবস্থা থাকবে না কেন?
এই প্রশ্নের দায় শুধু বর্তমান প্রশাসনের নয়। দীর্ঘ বাম আমল পেরিয়ে তৃণমূল সরকারেরও বহু বছর কেটে গিয়েছে। সান্দাকফুকে পর্যটন মানচিত্রে আরও পরিচিত করে তোলা হয়েছে, পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্বও বেড়েছে। অথচ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ছবিটা বদলায়নি। পর্যটক টানার ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু তাঁদের জীবন বাঁচানোর ন্যূনতম বন্দোবস্ত থাকবে না, এ কেমন পর্যটননীতি? একটি অ্যাম্বুল্যান্স, একটি সুসংহত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা অক্সিজেনের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা কি এতটাই কঠিন ছিল?
যদিও স্বাস্থ্য দপ্তরের দাবি, মানেভঞ্জনে পর্যটকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়, রয়েছে অক্সিজেন কনসেনট্রেটরও। অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকলে পর্যটকদের উপরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই পরামর্শ অনেকে মানেন না বলে জানিয়েছেন দার্জিলিংয়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ তুলসী প্রামাণিক। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য দপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া পর্যটকদের সান্দাকফুর পথে এগোতে দেওয়া উচিত নয়।
বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ মনে করেন, ‘হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের ক্রণিক সমস্যা থাকলে এসব উচ্চতায় যাওয়া এড়ানো উচিত। চিকিৎসকদের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের থেমে থেমে যাওয়া উচিত। কিছুটা দূরত্বে যাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে সেখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে তার পরেই আবার ওপরদিকে ওঠা উচিত।’
পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া অপরাধ নয়, ঝুঁকি জেনেও নিজের শরীরের সীমা অগ্রাহ্য করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু পর্যটকদের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। সান্দাকফুতে মৃত্যু ঠেকাতে কেবল কে ওপরে উঠতে পারবেন, তা নির্ধারণ করলেই হবে না; কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কীভাবে বাঁচানো হবে, তারও উত্তর দিতে হবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আনন্দ যেন আর কোনও পরিবারের কাছে প্রিয়জনকে হারানোর স্মৃতি হয়ে না থাকে।

