সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: বছর তিনেক আগেই কলকাতা পুরসভার কর্তা থেকে ইঞ্জিনিয়াররা শিয়রে ঝুলতে থাকা বিপদের আঁচ পেয়েছিলেন। সমীক্ষায় জানা গিয়েছিল, মাটির নীচে ইঁদুরের তৈরি সুড়ঙ্গের কারণে মহানগরীর ৬০ শতাংশের বেশি ফুটপাথ নীচ থেকে কার্যত ফাঁপা হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে ফুটপাথ থেকে নিকাশিনালার কংক্রিট ঢালাইয়ে কাচের গুঁড়ো মেশানো বাধ্যতামূলক করে কলকাতা পুরপ্রশাসন। ফলাফল কতটা মিলেছে, তা আজও জানা যায়নি। হালফিলে ফরাক্কায় রেললাইনে মারাত্মক ধসের পেছনেও ইঁদুরের গর্তকেই দায়ী করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
আমাদের আশপাশে মুদিখানা থেকে অন্যান্য দোকানে কান পাতলেই শোনা যায় ইঁদুরে কাটার ক্ষতির পরিসংখ্যান (Rat Menace)। ধূপগুড়ির এক মাঝারি গালামাল ব্যবসায়ীর দেওয়া হিসাবে, দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারশো টাকার সামগ্রী নষ্ট করে ইঁদুর। মাসের হিসেবে তা দশ হাজার টাকারও বেশি। গোটা জেলার বাজার ধরলে এই অঙ্কটা শিউরে ওঠার মতো। ধূপগুড়ির ব্যবসায়ী সংগঠন ‘ফোসিড’-এর সম্পাদক প্রদীপ পালের কথায়, ‘ব্যবসায়ীদের বড় অংশ গণেশের বাহন হিসেবে ইঁদুরের প্রতি ধর্মীয় কারণে দুর্বল। সেজন্য ইঁদুর মারায় সবাই রাজি হন না। তবে ক্ষতির পরিমাণ মারাত্মক। বিস্কুটের প্যাকেট আংশিক কাটলে লোকে পোষ্য কুকুর-বিড়ালের জন্য সস্তায় কেনেন বটে, কিন্তু জামাকাপড় বা প্রসাধন সামগ্রী নষ্ট হলে তা সটান বাতিলের খাতায় যায়।’
একই সুর জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক তথা দিনবাজারের ব্যবসায়ী দিলীপ সাহার গলায়। অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ীর বক্তব্য, ‘দোকান চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে কিছুটা রেহাই মেলে, নইলে বড় বিপদ। খাবারের অবশিষ্টাংশ এবং আবর্জনা জমলেই ইঁদুর ডেরা বাঁধে।’
বিজ্ঞান বলে, স্বাভাবিক নিয়মেই জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইঁদুরের দাঁত ক্রমাগত বাড়তে থাকে। কোনও শক্ত বস্তু কেটে সেই দাঁত ক্ষয়ে না নিলে একটা সময়ে নিজের দাঁত নিজের মুখেই বিঁধে ইঁদুরের প্রাণ যায়। সেই কারণেই প্রাণ বাঁচাতে প্রাণপণে জিনিসপত্র কেটে চলে মূষিকবাহিনী। এর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য মেলে বিশেষজ্ঞদের কথায়- ইঁদুর নিজের সন্তান উৎপাদন হার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। কোনও কারণে সংখ্যা কমে গেলে এরা নাগাড়ে বংশবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, ফাঁদ হোক বা বিষটোপ- যে কোনও বিপদের বার্তা নিজেদের মধ্যে দ্রুত আদানপ্রদান করতে পারে এরা।
এই পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথে সাবলীল চলাফেরায় পটু মূষিকবাহিনী নিয়ন্ত্রণে কার্যত হিমসিম খেতে হয় কৃষি দপ্তরকে। জলপাইগুড়ি জেলার মুখ্য কৃষি আধিকারিক বাবলুকুমার সাঁতরার কথায়, ‘বাস্তবে এ বড় কঠিন কাজ। দেশে প্রতি বছর ১০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদিত কৃষিপণ্য নষ্ট করে ইঁদুর। বংশবৃদ্ধিতে পটু এবং নিখুঁত নেটওয়ার্ক চালানো এই প্রাণীকে একই কায়দায় বারবার কবজা করা অসম্ভব। একমাত্র পথ এদের খাবারের জোগান বন্ধ রাখা এবং ধারাবাহিক সচেতনতা গড়ে তোলা।’
সরকারি দপ্তরের পুরোনো নথিপত্র রক্ষায় উইপোকার পাশাপাশি ইঁদুরও বড় মাথাব্যথা। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের মতো জায়গাগুলিতে যেখানে নথি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, সেখানে লড়াইটা আরও কঠিন। জলপাইগুড়ির জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক হারিস রশিদের কথায়, ‘পূর্বসূরিদের কাছে শুনেছি, পুরোনো রেকর্ড ও সরকারি নথি ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচানো মস্ত বড় লড়াই। আমাদের বিভাগ আজও সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’
স্থায়ী সমাধান কারও জানা নেই। দেবী লক্ষ্মীর বাণিজ্যে তাঁরই সহোদর গণেশের বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান শত্রু। আপাতত ১২৮৪ সালের জার্মানির হ্যামলিনের মতোই ২০২৬ সালেও এক বাঁশিওয়ালার অপেক্ষায় গোটা বাংলার মানুষ।

