রানিনগর শিল্পাঞ্চল পুরো বদলে গিয়েছে। চারদিকে বিজেপি ও ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা পতাকার দাপট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সিটুর অফিস ফের খুলেছে। কয়েক জায়গায় লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে। শ্রমিকদের চোখেমুখে স্বস্তির ছাপটা স্পষ্ট।
পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: আক্ষরিক অর্থেই পরিবর্তন হয়েছে। আগে চারদিকে স্রেফ ঘাসফুলের পতাকাই দেখা যেত। এখন দূরবিন দিয়েও এখানে সেই পতাকা খুঁজে পাওয়া দায়। গোটা রানিনগর (Raninagar) শিল্পাঞ্চলজুড়েই এখন শুধুই বিজেপি ও ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা পতাকার দাপট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সিটুর অফিস ফের খুলেছে। শিল্পাঞ্চলের কয়েক জায়গায় লাল পতাকাও পতপত করে উড়ছে। হাওয়া বুঝে এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত পলাতক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কৃষ্ণ দাসের ‘তোলাবাজ’-দের কয়েকজন বিজেপিতে ভেড়ার চেষ্টা করছে বলে খবর। আরএসএস প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস) অবশ্য তাদের কোনও সুযোগ দিতে এতটুকুও রাজি নয়। সংগঠনের উপদেষ্টা তরুণ রায়ের বক্তব্য, ‘শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে রানিনগর শিল্পাঞ্চল বিএমএসের ইউনিট কমিটি গঠিত হবে। সেখানে তোলাবাজদের জায়গা কোনওভাবেই হবে না।’ শিল্পের বিকাশ ও শ্রমিক স্বার্থে তাঁরা খুব শীঘ্রই রানিনগরে গিয়ে বৈঠক করবেন বলে তরুণ জানিয়েছেন।
রানিনগর শিল্পাঞ্চল বরাবরই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ‘খুব কাছের’। বিভিন্ন সময়ে এখানে শ্রমিক সংগঠনগুলি অবাধে তোলাবাজি চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নয়ের দশকে শিল্পাঞ্চল শুরুর সময়ে বাম নেতারাও এখানে তোলাবাজি চালিয়েছেন বলে অভিযোগ। কিন্তু পলাতক তৃণমূল নেতা কৃষ্ণ দাস ও তাঁর বাহিনীর তোলাবাজি এখানে রীতিমতো পাহাড়চূড়ায় পৌঁছেছিল। বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের ২৯টি কারখানার মধ্যে ১৯টি পুরোদমে চলছে। শিল্পের জন্য জমি নিয়ে যেগুলি ফেলে রাখা হয়েছিল সেগুলি কিছু শিল্পপতির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সেই জমিতে কারখানা গড়ছেন। সেগুলির কোনওটির কাজ অর্ধেক হয়েছে, কোনওটির নির্মাণকাজ শেষের পথে। গোটা শিল্পাঞ্চলজুড়ে এখন নীরবতার পরিবেশ। বেজায় শান্তির। সকলে শান্তিতে কারখানায় কাজে যাচ্ছেন, বাড়ি ফিরছেন। দোকানগুলিতেও নেতা-কর্মীদের আগের মতো আনাগোনা নেই। এক দোকানি সোজাসাপটা বলেই ফেললেন, ‘সকলে এই পরিবর্তনই চাইছিলেন।’
এরই মধ্যে শিল্পাঞ্চলে বামেদের শ্রমিক সংগঠনের ছন্দে ফেরার বিষয়টি অনেককে অবাক করেছে। গত বছর আইএনটিটিইউসি-র জলপাইগুড়ি সদর–২ সভাপতি রাজু সাহানি এই শিল্পাঞ্চলে থাকা সিটুর কার্যালয়টি বামেদের হাতে তুলে দিলেও কৃষ্ণ বাহিনী সেটি খুলতে দেয়নি। রাজ্যে পরিবর্তনের পর বামেরা নিজেরাই এই অফিস দখল করে সংস্কার করে। তবে তৃণমূল (TMC) এখনও চোরাগোপ্তা হানাদারি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। সিটুর জেলা সম্পাদক শুভাশিস সরকার বলেন, ‘৩০ মে এই কার্যালয়ের উদ্বোধন হবে। তবে তার আগে শনিবার তৃণমূলিরা এখানে ভাঙচুর চালায়।’ প্রবীণ বাম নেতা নিরঞ্জন রায়ের হুঁশিয়ারি, ‘তৃণমূলিদের তোলাবাজি আর কোনওমতেই বরদাস্ত নয়।’ শ্রমিকরা এখন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির শ্রমিক নেতা চাইছেন। বিজেপির জেলা সভাপতি শ্যামল রায়ের বক্তব্য, ‘শ্রমিকরা যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করাটাই আমাদের লক্ষ্য।’
এই পরিস্থিতিতে ঘাসফুল শিবির এখন কী করবে? জেলা আইএনটিটিইউসি সভাপতি তপন দে’র বক্তব্য, ‘রাজ্যে পরিবর্তনের পর আমরা এখন কয়েক মাস ধীরে চলো নীতি নিয়েছি। রানিনগর শিল্পাঞ্চল আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। কোনও তোলাবাজকে সংগঠনের রাখা হবে না।’ ওপরমহলের নির্দেশ এলে তাঁরা শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াবেন বলে রাজু জানান।
