সুভাষচন্দ্র বসু, বেলাকোবা: তিনি প্রাথমিক স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ৭৬ বছর বয়সে এসেও নেশা- সমাজসেবায় নিজেকে সমর্পণ করা। সে শ্মশানে শবদাহই হোক, বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান সামলানো, রক্তদান কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। রাজগঞ্জের (Rajganj) শিকারপুর অঞ্চলের বিবেকানন্দ কলোনি নিবাসী তপনকুমার শূর সর্বদাই একপায়ে খাড়া।
তপনের বয়স তখন দু’বছর। আদিবাড়ি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর থেকে তাঁর বাবা মণীন্দ্রনাথ শূর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে (তপন ও তাঁর বোন) অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার কুমারগ্রামে তাঁদের কাকা-কাকিমার আশ্রয়ে রেখে ফিরে যান। পরবর্তীতে সেখান থেকে তপনরা চলে আসেন শিকারপুরের বিবেকানন্দ উদ্বাস্তু কলোনিতে (তৎকালীন নাম)। ১০ বছর বয়সে বেলাকোবা আরআর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এরপর বেলাকোবা হাইস্কুল থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে বেলাকোবা বিটি কলেজ থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৭৫ সালে শিলিগুড়ি বাল্মীকি বিদ্যাপীঠ প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে জলপাইগুড়ি জেলার কামরাঙ্গাগুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন, সেখান থেকে ১৯৭৯ সালে রাজগঞ্জের মালিভিটা নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০০৯ সালে অবসরগ্রহণ করেন তপন।
তপনের পরিবার বলতে শুধু স্ত্রী কৃষ্ণা শূর। নিঃসন্তান এই দম্পতি। তপন জানালেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি শ্মশানযাত্রায় যাওয়া শুরু করেন। বড়রা বারণ করলেও তিনি শুনতেন না। সঠিক হিসেব না থাকলেও এ পর্যন্ত এক হাজারের ঊর্ধ্বে শবদাহ করেছেন। সেই সময় গড়ে ওঠেনি বেলাকোবা গ্রামীণ হাসপাতাল। এলাকার মানুষ নির্ভর করতেন জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের ওপর। স্থানীয় রোগীদের সেই হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। প্রয়োজনে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেও। এখানেই শেষ নয়, বহু মুমূর্ষু রোগীকে রক্তদান করে জীবন বাঁচিয়েছেন এই ব্যক্তি। এলাকার প্রদ্যুৎ দাস, সুবোধ রায়দের বক্তব্য, নিঃস্বার্থভাবে তাঁদের পরিবারের চিকিৎসায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তপন।
ছোটবেলা থেকেই অনুষ্ঠানবাড়িতে বিনা নিমন্ত্রণে চলে গিয়ে খাওয়ার জায়গায় জল পরিবেশন করতেন। পরবর্তীতে বিয়েবাড়ির নানা দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করে আসছেন। গত মাসেও চারটি বিয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
১৯৮০ সালে শিকারপুরে হাতির উপদ্রব শুরু হয়। তদানীন্তন ডিএফও তাঁকে একটি হাতি সংক্রান্ত বই দিয়েছিলেন। সেই বই পরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এরপর বন দপ্তর ১০ বছর ধরে লোকালয় থেকে হাতি তাড়ানোর জন্য তাঁকে নিয়ে যেত।
২০২৩ সালে তপনের হার্ট অপারেশন হয়েছে। সমসাময়িক বন্ধু বিজন বোস, ভূপেন্দ্রনাথ মিত্র, শক্তি চাকিরা গত হয়েছেন। এখনও তপন রাতবিরেতে এলাকাবাসীর ডাকে উপস্থিত হন। ছোটবেলায় মা এবং বর্তমানে স্ত্রীর সমর্থনে তিনি এই সামাজিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানালেন তপন।
এই বয়সেও নিঃস্বার্থভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সঁপে দেওয়া ব্যক্তি সমাজে দুর্লভ বলে মন্তব্য বেলাকোবার প্রবীণ দিকপাল ফুটবল খেলোয়াড় সুবোধ রায়ের।
