রায়গঞ্জ: বুধবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা। রায়গঞ্জ পুর (পুরসভা) বাস টার্মিনাসের (Raiganj Bus Terminus) সামনে প্রতিদিনের চেনা যানজট, টোটো-অটোর কান ফাটানো হর্ন আর হুড়োহুড়ির বদলে এদিন দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য ও শান্ত ছবি। যে জায়গায় প্রতিদিন অফিস টাইমে হর্ন আর ভিড়ে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে এদিন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। নিত্যযাত্রী পেশায় শিক্ষিকা রাখি বিশ্বাসের কথায়, ‘প্রতিদিন রেলগেট অতিক্রম করে স্কুলে আসতে যানজটে নাভিশ্বাস অবস্থা হয়। আজ বাস টার্মিনাস এলাকায় কোনও ভিড় বা যানজট চোখে পড়েনি। আজ অনেকদিন পর যানজটমুক্ত শহর দেখলাম। এমন শহর সারাবছর দেখতে চাই।’
প্রশাসনের নতুন নির্দেশ কার্যকর করতে সকাল থেকেই সেখানে মোতায়েন ছিলেন সিভিক ভলান্টিয়ার ও পুলিশকর্মীরা। তাঁদের তৎপরতায় বাস টার্মিনাসের মূল গেট এবং রেলগেটের সামনে কোনও যানবাহনকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। তিন চাকার টোটো ও অটোগুলি স্টেশন রোডের একপাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলে দ্রুত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ কোনও গাড়ি দাঁড়িয়ে না থাকায় রাস্তার যান চলাচল ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। যদিও কয়েকজন যাত্রী প্রথম দিকে কিছুটা অসুবিধার মুখে পড়েন। বাস ধরার জন্য তাঁদের বাস টার্মিনাসের ভেতরে হেঁটে যেতে হয়, যা নিয়ে কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেন। তবে সামগ্রিকভাবে মানুষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে বাস ধরতে নিত্যযাত্রী পার্থসারথী মিত্র, অনুপ সাহা, দীপা দত্ত সহ অন্যরা দাঁড়াতেই পুলিশকর্মীরা অনুরোধ করেন, আজ থেকে এখানে দাঁড়াবেন না। বাস টার্মিনাসের ভেতরে গিয়ে বাসে উঠতে হবে। তাঁরা প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে টার্মিনাসের ভেতরে গিয়ে বাসে ওঠেন। পার্থের কথায়, ‘প্রশাসনের নির্দেশ মানতেই হবে। তবে এই নিয়ম যেন সারাবছর কার্যকর থাকে।’
টোটো ও অটোচালকরা স্টেশন রোডে দাঁড়ালেও কে আগে যাত্রী নেবেন তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চোখে পড়ে। অধিকাংশ অটো বিন্দোল, ভাটোল ও হেমতাবাদ রুটের। তবে এদিন দেখা যায়, বেশকিছু টোটো রানিং অবস্থায় বাস টার্মিনাসের মুখে দাঁড়াতেই সিভিক ভলান্টিয়াররা লাঠি নিয়ে তাড়া করে সরিয়ে দেয়। অটোচালক সাদ্দাম হোসেন বললেন, ‘আমরাও চাই শহর যানজটমুক্ত হোক। তবে এই নিয়ম যেন সকলের ক্ষেত্রে বলবৎ হয়। দুইদিন পর যেন দেখা না যায়, নেতারা এসে চেন সিস্টেম চালু করেছেন। চাঁদা দাবি করছেন। একই বক্তব্য শোনা গেল দিল মহম্মদ, কার্তিক বর্মনও মহাদেব রায়দের গলাতেও।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বাস টার্মিনাস ও রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তীব্র যানজটের সমস্যা ছিল। সেই সমস্যার সমাধানেই এদিন থেকে ওই এলাকায় কোনও যানবাহন দাঁড়াতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এদিকে, বাস টার্মিনাসের ভেতরে নর্দমার ওপর থাকা অধিকাংশ দোকান ইতিমধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন অটোগুলির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয়েছে। যদিও এখনও হাতেগোনা কয়েকটি অস্থায়ী দোকান রয়ে গিয়েছে। নতুন নিয়ম চালুর প্রথম দিনে অফিস টাইমে বাস টার্মিনাস সংলগ্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনও যানজট দেখা যায়নি। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আমজনতা।
বাসগুলিও এদিন বাস টার্মিনাসের মুখে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলেনি। বাস মালিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্লাবন প্রামাণিকের বক্তব্য, ‘প্রশাসনের নিয়ম মেনে চলার জন্য বাসকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ যানজটের কারণে সকলে নাজেহাল হন প্রতিদিন।’ এবিষয়ে রায়গঞ্জের মহকুমা শাসক তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়েয় প্রতিক্রিয়া, ‘বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকার সবাইকে সচেতন করা হয়েছে। আশা করি সকলে নিয়ম মেনে চলবে।’

