উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: গত দুই দশকে আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেকটাই বেড়েছে। তা সত্ত্বেও, মানসিক সংকটের সময় ঠিক কার কাছে যাওয়া উচিত- একজন মনোবিদ (যাঁকে থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলার বলা হয়) নাকি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট)-এর কাছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও প্রচুর বিভ্রান্তি রয়েছে (Psychiatrist vs. Psychologist)। এই ধারণার অভাব বা অস্পষ্টতার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের সঠিক চিকিৎসা পেতে অনেক সময় অযথা দেরি হয়ে যায়। আর এই দেরির ফলে রোগীর সমস্যা আরও গুরুতর আকার নেয়। মানসিক স্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি নিয়েই বিশেষ প্রতিবেদন।
দেরিতে চিকিৎসার কুফল এবং সামাজিক ভীতি
মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেরি হওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গুরুগ্রামের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জ্যোতি কাপুর। তিনি জানান, এমন অনেক রোগী আছেন যাঁরা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে মানসিক কষ্টে ভোগার পর শেষমেশ একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছান। এর পেছনে প্রধানত সামাজিক লজ্জা, ‘পাগল’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে নানা অমূলক উদ্বেগ কাজ করে। অনেকেই হয়তো কোনওরকম ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র থেরাপি চালিয়ে যান, আবার অনেকে নিজে নিজেই সমস্যাগুলো সামলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এর ফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয় না।
দেরি করার ফলে রোগীদের উপসর্গগুলি ক্রমশ তাঁদের মনের গভীরে গেঁথে যায় এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব সমস্যা হয়তো খুব সহজেই সারিয়ে তোলা যেত, দীর্ঘসময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে সেগুলোর জন্যই অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন এই মানসিক কষ্ট চেপে রাখার ফলে রোগীর কর্মজীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করে।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ
বাস্তব জীবনের বেশ কিছু ঘটনা এই বিলম্বের ভয়াবহতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মানুষের ভুল ধারণা কীভাবে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে, তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ দিল্লির ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরীর ঘটনা। ওই কিশোরী দীর্ঘদিন ধরে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) বা একধরনের গুরুতর মানসিক ব্যাধিতে ভুগছিল। তার পরিবার প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র থেরাপির পথ বেছে নিয়েছিল, যা ওই কিশোরীর ক্ষেত্রে মোটেও কার্যকরী হয়নি। ধীরে ধীরে তার অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে, সে তার দশম শ্রেণির পরীক্ষাও দিতে পারেনি এবং এক পর্যায়ে আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। এই চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর পর, তার বাবা-মা অবশেষে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেন।
অন্য একটি ঘটনায়, এক কিশোরের মধ্যে অস্বাভাবিক সন্দেহের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করেছিল। তার পরিবার প্রথমে ভেবেছিল স্কুলে বন্ধুদের দ্বারা নিগৃহীত হওয়ার কারণেই সে এমন আচরণ করছে। একজন মনোবিদের কাছে যাওয়ার পরও তার অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। বরং তার মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সে স্কুলে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। প্রায় এক বছর পর অবশেষে তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না করলে যে কতটা সময় নষ্ট হতে পারে, এটি তার একটি বড় প্রমাণ।
করণীয়
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (নিমহ্যান্স)-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক সীমা মেহরোত্রা বলেন, কখন কার কাছে যেতে হবে, তার কোনও সহজ উত্তর নেই। এটি নির্ভর করে রোগীর সমস্যার ধরন, জটিলতা এবং অন্যান্য কোনও শারীরিক অসুস্থতা আছে কি না তার ওপর।
অধ্যাপক মেহরোত্রা জানান, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মনখারাপ বা মানসিক চাপের সঙ্গে গুরুতর মানসিক অসুস্থতার (যেমন বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ) পার্থক্য করার রেখাটি আমাদের সমাজে অনেকটাই অস্পষ্ট। অনেকেই যে কোনও মানসিক সমস্যাকেই জীবনের একটি ‘সাময়িক পর্যায়’ বলে ধরে নেন। তবে গুরুতর মানসিক অবস্থার কিছু নির্দিষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ থাকে। যেমন নেতিবাচক চিন্তাভাবনা, শরীরে শক্তির অভাব, ঘুমের চরম ব্যাঘাত, খাওয়ার রুচিতে পরিবর্তন এবং সামাজিক মেলামেশা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া। এইসব সমস্যা কতদিন ধরে চলছে এবং এর ফলে রোগীর দৈনন্দিন কাজ কতটা ব্যাহত হচ্ছে- তার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ওষুধ ও থেরাপি : একে অপরের পরিপূরক
ভুবনেশ্বরের মণিপাল হসপিটালের মনোবিদ শিবানী ত্রিপাঠী মানসিক চিকিৎসা নিয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন। অনেকেই মনে করেন থেরাপি এবং ওষুধের মধ্যে যে কোনও একটি বেছে নিতে হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতে, এই দুটি একে অপরের পরিপূরক, বিকল্প নয়।
বিষয়টিকে সহজ করে বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ঠিক যেমন ডায়াবিটিস বা চোখের কোনও সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতির সংমিশ্রণ প্রয়োজন হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই। ওষুধ রোগীর শারীরিক ও জৈবিক দিকগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, আচরণগত পরিবর্তন- যেমন থেরাপি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানিয়ে নেওয়ার কৌশল- রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে সমানভাবে সাহায্য করে। চরম রাগের সমস্যায় ভোগা কোনও রোগীকে প্রথমেই থেরাপি দিয়ে লাভ হয় না। আগে ওষুধের মাধ্যমে তাঁকে শান্ত করতে হয়, তবেই তিনি থেরাপিতে মনোযোগ দিতে পারেন।
সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্ব
চিকিৎসার ক্ষেত্রে এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিদ এবং সমাজকর্মীরা একসঙ্গে মিলে কাজ করবেন। এরফলে রোগীরা সুসংগঠিত এবং সঠিক চিকিৎসা লাভ করতে পারেন। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে, সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ ও সুন্দর জীবনের মূল চাবিকাঠি।
