শুভঙ্কর চক্রবর্তী
প্রশান্তকে (Prashanta Barman) বাঁচাতে পদে পদে আইন নিয়ে ছেলেখেলা করছে পুলিশ। তদন্তকারীর রুলবুক মনে করিয়ে এমনই অভিযোগ তুলেছেন হাইকোর্টের আইনজীবীরা। ইচ্ছে করেই যে খুনের মামলায় প্রশান্ত বর্মনকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ তা ক্রমেই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হচ্ছে। আইনজীবীদের বক্তব্য, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা একজন আসামিকে হেপাজতে নেওয়ার জন্য যা যা পদক্ষেপ করা উচিত ছিল তার কোনওটিই করেনি পুলিশ। অভিযোগ, পুলিশের ওপরমহল থেকে ছক কষেই প্রশান্তকে বারবার পালানোর রাস্তা করে দেওয়া হচ্ছে।
স্বপন খুনের মামলা (Swapan Kamilya Homicide Case) নথিভুক্ত আছে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় (Bidhannagar Police)। মামলার তদন্ত করছে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের গোয়েন্দা বিভাগ। সোমবার রাতে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে প্রশান্ত গ্রেপ্তার হন একই কমিশনারেটের ইকো পার্ক থানায়। ইকো পার্ক থেকে বিধাননগর দক্ষিণ থানার দূরত্ব ১০ কিলোমিটারেরও কম। অপহরণ করে খুনের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অপরাধের প্রধান আসামি (যিনি পলাতক) ধরা পড়ার খবর দশ কিলোমিটার দূরের থানায় পৌঁছায়নি সেই যুক্তি মানতে নারাজ কেউই। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারির জন্য পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষিত দল আছে। সমাজমাধ্যমে পান থেকে চুন খসলেই পুলিশ আইনি পদক্ষেপ করে। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে প্রশান্তর দুর্ঘটনা ঘটানোর লাইভ ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়েছিল। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অথচ সেই খবর বিধাননগর কমিশনারেটের তদন্তকারী গোয়েন্দা বা বিধাননগর দক্ষিণ থানার আধিকারিকরা জানলেন না তা কোনওভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
গোয়েন্দাদের সোর্স পুলিশের চাইতেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া যেতেই পারে, প্রশান্তকে নিয়ে হইচইয়ের খবর তাদের কাছে ছিলই। হাইকোর্টের আইনজীবী নারায়ণ দেবনাথের বক্তব্য, ‘সেক্ষেত্রে প্রশান্তকে খুনের মামলায় শোন অ্যারেস্টের আবেদন করা উচিত ছিল পুলিশের। তা না করলে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মামলায় জামিন পেয়ে প্রশান্ত যখন আদালত থেকে বাইরে বের হল, তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল।’ একটি কেসে জামিন পাওয়া আসামিকে অন্য কেসে আদালতের গেট থেকে গ্রেপ্তার করার ভূরিভূরি নজির আছে। তবুও গোয়েন্দারা তাঁকে ধরতে কেন কোনও পদক্ষেপ করলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্বপন কামিল্যা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিধাননগর কমিশনারেট তোলপাড় হয়েছে৷ ওই কেসের ব্যাপারে সবাই ওয়াকিবহাল। তা সত্ত্বেও ইকো পার্ক থানা পরোয়ানা থাকা একজন আসামিকে গ্রেপ্তারের পরও কেন একই কমিশনারেটের অন্য থানায় বা হেড কোয়ার্টারে খবর দিল না তা রহস্যময়। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘রুলবুক মেনে পুলিশের যা যা করা দরকার পুলিশ তা করেনি। একজন পলাতক আসামিকে ধরেও ছেড়ে দেওয়া আসলে আইন নিয়ে ছেলেখেলা করা। পুলিশ জেনেবুঝেই সব করেছে।’
আসলে পুলিশ যখন নিজেই আসামির বডিগার্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। প্রশান্তকে যেভাবে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট সুপরিকল্পিতভাবে বাঁচিয়ে চলেছে, তার অন্তর্তদন্তে এক বিস্ফোরক চিত্রনাট্য সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট যেখানে অভিযুক্তের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করেছে সেখানে দ্রুত গ্রেপ্তার না করে, দিনের পর দিন পুলিশ প্রশান্তকে আড়াল করে চলেছে। আর পুলিশের এই বেআইনি রক্ষাকবচকে কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত যাতে তাঁর বিপুল বেনামী সম্পত্তি এবং প্রমাণ লোপাট করতে পারেন, তার জন্য নেপথ্য থেকে সমস্ত রকম প্রশাসনিক ও আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্বপনের স্ত্রী মমতা কামিল্যা। তাঁর অভিযোগ, ‘পুলিশ প্রশান্তকে বাঁচাচ্ছে যাতে ও প্রমাণ নষ্ট করে ফেলতে পারে। আমি যদি খুন করতাম তাহলে আমাকে কি ছেড়ে দিত পুলিশ?’ বিধাননগর কমিশনারেটের কর্তারা অবশ্য কোনও বিষয়েই মুখ খুলতে নারাজ। তাঁদের এক বুলি, ‘সংবাদমাধ্যমে কিছু বলা যাবে না।’
সূত্রের খবর, জামিন পাওয়ার পর রাতে কলকাতাতেই ছিলেন প্রশান্ত। পরের দিন তাঁর বিশেষ বান্ধবী এক প্রভাবশালীর বাড়িতেও গিয়েছিলেন। কী উদ্দেশ্যে বা কোন বার্তা নিয়ে প্রশান্তর বান্ধবী প্রভাবশালীর বাড়িতে গিয়েছিলেন তা রহস্যময়। মমতা যে অভিযোগ তুলেছেন, সূত্র বলছে, তা অনেকাংশেই সত্য। ইতিমধ্যেই প্রশান্ত তাঁর বেআইনি সম্পত্তি গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার ছক কষছেন। কয়েকটি বেনামী সম্পত্তি বিক্রিও করে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। শিলিগুড়ির এক আইন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রির কারসাজি চলছে।
তবে এতকিছুর পরেও প্রশান্তকে নাগালে পেয়েও ধরতে না পারার জন্য বিধাননগর পুলিশের কোনও আধিকারিকের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হয়নি বা না ধরার পেছনে কোনও ষড়যন্ত্র আছে কি না তা জানতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়নি। যে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দিয়ে বলছে সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় একাধিকবার অভিযান চালিয়েও প্রশান্তকে পাওয়া যায়নি সেই পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।
