Prashanta Barman | শাসন বদলালেও অধরাই প্রশান্ত, পুলিশের ভূমিকায় উঠছে প্রশ্ন

Prashanta Barman | শাসন বদলালেও অধরাই প্রশান্ত, পুলিশের ভূমিকায় উঠছে প্রশ্ন

ব্লগ/BLOG
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

রাজ্যে ক্ষমতার সিংহাসনের হাতবদল হয়েছে, রাজদণ্ডের রং বদলেছে, কিন্তু রাজগঞ্জের অপসারিত ‘পলাতক’ বিডিও প্রশান্ত বর্মনের (Prashanta Barman) অন্তর্ধানে থাকার জাদুকরি দক্ষতায় বিন্দুমাত্র মরচে পড়েনি। কীর্তিমান প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় ৩ জুন কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta Excessive Court docket) বিচারপতি পুলিশকে কড়া ধমক দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের জন্য বেঁধে দিয়েছিলেন দশদিনের ‘ডেডলাইন’। কিন্তু নির্দেশের চোদ্দোতম দিনেও প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করতে পারল না পুলিশ। একধাপ এগিয়ে এখন হয়তো এটা বলাই যায় যে, পুলিশ প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করল না। আসলে শাসনতন্ত্রের মলাট পালটালেও ভেতরের অপরাধী-আমলা-পুলিশের বোঝাপড়ার চিত্রনাট্য যে অপরিবর্তীত থেকে গিয়েছে প্রশান্তই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। তাই ভিভিআইপি আসামিকে ছুঁতে পুলিশের হাত কাঁপছে। ফলে ক্রমেই ধূসর হচ্ছে ‘আইনের চোখে সবাই সমান’- এই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা। সাধারণ মানুষের কাছে নষ্ট হচ্ছে পুলিশের ভাবমূর্তি।

প্রশান্তকে আড়াল করার যে অলিখিত ছাড়পত্র পূর্বতন জমানার পুলিশ দিয়েছিল, নতুন সরকারের অধীনেও সেই একই অদৃশ্য হাত কাজ করে চলেছে। এই ঘটনা থেকে আমআদমির মনে ক্রমেই এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ব্যক্তিদের রং বদলালেও অপরাধী ও পুলিশের যোগসূত্রের যে গভীর শিকড়, তা উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। ৩ জুনের শুনানিতে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত কড়া। বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করা গেল না, তা রীতিমতো রহস্যজনক। ওইদিন মামলায় ধৃত তৃণমূল নেতা সজল সরকারের জামিনের আবেদন খারিজ করার পাশাপাশি মামলার তদন্তকারী আধিকারিক শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারপতি। অভিযোগ ছিল, চার্জশিটে প্রশান্ত বর্মনের নাম সরাসরি না লিখে ‘এফআইআরে (FIR) নাম থাকা অভিযুক্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে আইনি ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।

তদন্তকারী আধিকারিক যে আইন অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থ হয়েছেন, তা আদালতের রায়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে (ডিজি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এই গাফিলতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ১০ দিনের মধ্যে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দিতে। সেই ১০ দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও রাজ্যবাসীর সামনে কোনও উত্তর নেই। ডিজির রিপোর্ট আদৌ জমা পড়েছে কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী আধিকারিকের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে কি না, তা সম্পূর্ণ কুয়াশাবৃত। পুলিশের কোনও আধিকারিক প্রশান্তর বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাইছেন না। পুলিশ সূত্রের খবর, শনিবার রাতে প্রশান্তর নিউটাউনের বাড়িতে গিয়েছিল একদল পুলিশ। কিন্তু সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। প্রশান্ত কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছেন তাও স্পষ্ট নয়। হাইকোর্টের নির্দেশের পর আলিপুরদুয়ারের বীরপাড়া সংলগ্ন একটি হোটেলে প্রশান্তকে দেখা গিয়েছিল। আগেও ওই হোটেলে প্রশান্ত ছিলেন বলেই অভিযোগ। যদিও প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকদের একটা অংশ বলছে, পুলিশের সদিচ্ছা থাকলে প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করা বড় কোনও ব্যাপরই নয়।

প্রশ্ন উঠছে, একটি নির্বাচিত সরকার পরিবর্তনের ঢোল বাজানোর পরও কেন একজন খুনের মামলার অভিযুক্ত আমলাকে এভাবে আড়াল করা হচ্ছে? নতুন সরকার যখন রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের দাবি তুলছে, তখন প্রশান্তর মতো একজন দাগি পলাতক আসামিকে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে দেওয়া কি সেই দাবির মুখে মস্ত বড় চপেটাঘাত নয়? কয়েকদিন আগে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগে পুলিশ প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, জামিন অযোগ্য খুনের মামলার ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেননি আধিকারিকরা। এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে! এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, পুলিশের শীর্ষ স্তর থেকে শুরু করে স্থানীয় থানা পর্যন্ত প্রশান্তকে বাঁচানোর একটি সুসংগঠিত চক্রান্ত চলছে। সরকার পরিবর্তন হলেও পুলিশি ব্যবস্থার এই পক্ষপাতিত্ব প্রমাণ করে যে, ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনও প্রভাবশালী যোগসাজশ রয়েছে৷

এপ্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি বিশদে কিছুই জানেন না। পরে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘আমি জেনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।’

তবে, সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, প্রশান্ত বর্মনের কাছে এমন কী গোপন তথ্য বা রাজনৈতিক রসদ রয়েছে, যার কারণে নতুন জমানার কর্তারাও তাঁকে স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছেন? নাকি ক্ষমতার হাতবদল হলেও প্রভাবশালীদের সেই পুরোনো সিন্ডিকেটরাজ এখনও নেপথ্য থেকে পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করছে? তাহলে কি শাসক বদলালেও সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়ানো যায়নি? আইনের চোখে সবাই সমান— এই আপ্তবাক্যটি রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিওর ক্ষেত্রে একটি বড় কৌতুক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন একজন সাধারণ অপরাধীকে ধরতে পুলিশ অতিসক্রিয়তা দেখায়, তখন সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের জোড়া নির্দেশের পরও একজন বিডিওকে ধরতে পুলিশের এই চরম নিষ্ক্রিয়তা বেআইনি কর্মকাণ্ডকেই প্রশ্রয় দেবে।

যদিও রাজ্যের আইন প্রতিমন্ত্রী বিরাজ বিশ্বাস উত্তরবঙ্গ সংবাদকে বলছেন, ‘প্রশান্তকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ওঁকে পুলিশ খুঁজছে। লুকআউট নোটিশও জারি হবে। খুব শীঘ্রই গ্রেপ্তার হবে।’

হাইকোর্টের আইনজীবীরা আশা করেছিলেন যে, ১০ দিনের ডেডলাইন এবং কমপ্লায়েন্স রিপোর্টের কড়া নির্দেশের পর পুলিশ বাধ্য হয়ে পদক্ষেপ করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এতসবের পরেও হেলদোল নেই পুলিশের।

প্রশান্ত বর্মনের এই অন্তহীন ‘পলাতক’ জীবন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশি ব্যবস্থার গালে কলঙ্কের দাগের মতোই, যা মোছার কোনও সদিচ্ছাই বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। শাসন বদলালেও যদি প্রশান্তরা আইনের নাক কেটে রাজার হালে থাকেন, তবে নানা প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ যে নতুন ভোরের আশা করেছিলেন, তা এই একটি ঘটনাতেই বারেবারে জোর ধাক্কা খাচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *