শুভঙ্কর চক্রবর্তী
কাঁকরভিটার (Kakarbhitta) ব্যস্ত বাজারে দাঁড়িয়ে কয়েকশো মিটার দূরের একটি অভিজাত হোটেলের ভেতরে কী খেলা চলছে তা বোঝার উপায় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পর্যটকদের আনাগোনা, ক্যাসিনোর ঝলমলে আলো, বিলাসবহুল গাড়ির যাতায়াত সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হোটেল কর্মীদের সঙ্গে গল্প করলে উঠে আসে কালো কারবারের (Nepal black cash) অজানা কাহিনী। তৃণমূল নেতাদের গুপ্তধনের খোঁজে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিনের অনুসন্ধানে এবং তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলে যে ইঙ্গিত মিলেছে, তা আরও উদ্বেগের। সূত্রের খবর, নেপালের (Nepal) হোটেল ব্যবসায়ীর কাছে গচ্ছিত থাকা কোটি কোটি টাকার শেষ গন্তব্য আদৌ নেপাল নয়। চা খেতে খেতে নেপাল পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক আধিকারিক ফিশফিশ করে বললেন, ‘কাঁকরভিটা শহরটি আদতে একটি ট্রানজিট ভল্টের মতো। অর্থাৎ, টাকা কিছুদিনের জন্য এখানে নিরাপদে রাখা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক হাওয়ালা নেটওয়ার্কের (Hawala community) মাধ্যমে তা ধাপে ধাপে বিদেশে চলে যায়। আমাদের সন্দেহ, সুইৎজারল্যান্ডের কিছু ব্যাংকেও টাকা যাচ্ছে।’
গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, বেআইনি অর্থের পরিচয় পালটানোই মূল কাজ নেপালের ব্যবসায়ীদের। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসা এবং আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে সেই অর্থের পরিচয় পালটানো হয়। নেপাল পুলিশ এই প্রক্রিয়াকে বলছে, ‘লেয়ারিং’। যেখানে একের পর এক স্তর তৈরি করে টাকার প্রকৃত উৎস আড়াল করা হয়। তদন্তকারীদের সন্দেহ, সবশেষে সেই অর্থ এমন কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে, যেখানে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। পুরো কাজটি হয় কোডের মাধ্যমে। নেপালের হোটেলের গোপন ঘরে ঢুকতে হলেও দরকার কোড। এক গোয়েন্দা আধিকারিকের বক্তব্য, ‘কেউ কোটি কোটি টাকা বছরের পর বছর একটি হোটেল ব্যবসায়ীর কাছে ফেলে রাখবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এই ধরনের নেটওয়ার্কের লক্ষ্যই হল অর্থের উৎস মুছে ফেলা। নেপাল সেই প্রক্রিয়ার একটি ধাপ মাত্র।’
এই পুরো চক্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হল কোনও লিখিত নথি না থাকা। ব্যাংক ট্রান্সফার নেই, চেক নেই, অনলাইন লেনদেন নেই। আছে শুধু কোড ওয়ার্ড, বিশ্বস্ত বাহক এবং বহু বছরের সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি আন্তর্জাতিক হাওয়ালা নেটওয়ার্ক। ফলে টাকা কোথা থেকে এল, কোথায় গেল তার প্রমাণ সংগ্রহ করাই তদন্তকারীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ইকনমিক অফেন্স বিভাগের এক নামকরা আধিকািরকের কথা, ‘নেপালকে আমরা এখন শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখছি না। এখান থেকেই তদন্তের আন্তর্জাতিক অধ্যায় শুরু হচ্ছে। যদি বিদেশি ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের যোগসূত্র প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু দুর্নীতির মামলা থাকবে না, তখন সেটা আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের মামলা হবে। তবে আমরা সন্দেহের বশে কাউকে গ্রেপ্তার করলেও আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা শক্ত। তাই খুব শক্তপোক্ত প্রামাণ্য নথি না থাকলে এইসব ক্ষেত্রে কেউ গ্রেপ্তারির রাস্তায় যায় না। সেক্ষেত্রে আমাদের কাজ হল সবটা লক্ষ রেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট পাঠানো।’
ওই আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে ইতিমধ্যেই এমন কিছু তথ্য এসেছে, যেখানে কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীর ঘনঘন সন্দেহজনক নেপাল সফরের সূচি পাওয়া গিয়েছে। সেই সূত্র ধরেই নেপালে জমা হওয়া অর্থের কোনও অংশ ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সীমান্তের এপারে রাজনীতির পালাবদল হয়েছে। ওপারে কাঁকরভিটার হোটেলে অবশ্য তার কোনও প্রভাব পরেনি। ভিড় আগের মতোই আছে। সেই ভিড়ের আড়ালেই প্রশস্ত হচ্ছে বাংলার দুর্নীতির শয়ে-শয়ে কোটি টাকার গোপন যাত্রাপথ। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা এবার অবশ্য সহজে হার মানতে নারাজ। কোথায় গেল দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা তার উত্তর খুঁজতে সীমান্তের ওপারে তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের একটি দল কাঁকরভিটায় গিয়ে নেপাল পুলিশের সাহায্যে একাধিক হোটেলের তথ্য সংগ্রহ করেছে। গত কয়েকদিন থেকে কাঁকরভিটার বেআইনি লেনদেনের হোটেলে লুকিয়ে আছেন আলিপুরদুয়ারের এক নেতা। সূত্রের খবর, বেশ কিছুদিন থেকেই তিনি ময়নাগুড়ির জল্পেশ মন্দির লাগোয়া একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। শ্রাবণীমেলা শুরু হতেই ওই এলাকায় পুলিশের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় জল্পেশ থেকে পালিয়ে তিনি কাঁকরভিটার হোটেলে আশ্রয় নিয়েছেন। একটি সুপার ডিলাক্স ক্যাটিগোরির ঘরে আছেন ওই নেতা। চারদিনের জন্য আগাম ক্যাসিনো বুকও করে রেখেছেন তিনি। ওই নেতার অবৈধ কারবারের টাকাও হোটেল ব্যবসায়ীর কাছে গচ্ছিত আছে বলেই খবর।
অন্যদিকে, নেপালে কালো টাকার বেআইনি কারবারের কথা ফাঁস হতেই শিলিগুড়ির পানিট্যাঙ্কি মোড় এবং বীরপাড়ার হাওয়ালা ডেরায় কারবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সবাইকে সতর্ক করে মেসেজও পাঠানো হয়েছে। শিলিগুড়ির দুই অবাঙালি ব্যবসায়ী যাঁরা মূলত হাওয়ালার কারবার সামলান এদিন দুপুরেই তাঁরা কাঁকরভিটার হোটেলে পৌঁছে যান। রাত্রি দশটা পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আরও একজনকে গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে ঢুকতে দেখা গিয়েছে। তবে তাঁর সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। গুপ্তধনের অন্ধকার পথে আলো পড়তেই হইচই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলেও।

