রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: রামের বাবার চিকিৎসায় যেন বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়, মেয়র সেই কথা বলে দিয়েছেন মেডিকেলের সুপারকে (NBMCH)। অভিযোগ, তারপরেও ভালোভাবে খেয়াল রাখা হচ্ছে না। তাই সুপারের সঙ্গে দেখা করবেন বলে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ঠায় অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে শিলিগুড়ির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাম পাসোয়ান।
দুপুর তখন সাড়ে ১২টা পেরিয়েছে। অথচ সুপার তো দূর অস্ত, অতিরিক্ত সুপার এবং ডেপুটি সুপার সহ অন্য আধিকারিকদের দেখা নেই হাসপাতালে। এদিকে ঘরে আলো জ্বলছে, পাখা চলছে, বাতানুকূল মেশিনের সৌজন্যে ঘরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। শুধু রাম নন, চিকিৎসার আর্জি থেকে এমআরআইয়ের অনুমতি পেতে, আইসিইউতে শয্যার দাবি জানাতে বহু রোগী ও তাঁদের পরিজনদের ভিড় দেখা গেল। বিভিন্নরকম সমস্যার কথা জানাতে আসছেন চিকিৎসক, নার্সরাও। ফাইল নিয়ে ঘুরছেন কর্মীরা। সুপার তো এখানে আসেন না। বাকিরা কখন আসবেন, বলা মুশকিল। ছবিটা উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের।
স্থায়ী সুপার না থাকায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সবাই। অভিযোগ, তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাকিরাও ফাঁকিবাজি করছেন। ফলে রোগী পরিষেবার মান ঠেকেছে তলানিতে। এপ্রসঙ্গে মেডিকেলের রোগীকল্যাণ সমিতির সদস্য শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের প্রতিক্রিয়া, ‘বেশ কিছু বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যা মিটবে।’ এই আশার আলো দেখার অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ।
ডাঃ সঞ্জয় মল্লিক প্রায় তিন বছর উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপারের দায়িত্ব সামলেছেন। এবছরের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাঁকে কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ করে স্বাস্থ্য দপ্তর। তবে, তাঁকে সুপারের দায়িত্বেও রেখে দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর সঞ্জয় হাসপাতাল ছেড়ে কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের চেয়ারে বসছেন। সেই অফিস ঘরটিকে তিনি কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে ঝাঁ চকচকে করে তুলেছেন। কিন্তু সুপার অফিসে তাঁর দেখা নাই।
মেডিকেলের অধ্যাপক চিকিৎসকদের একাংশের মতে, ডাক্তারির পঠনপাঠনের ওপর নজর রাখতে কলেজ অধ্যক্ষের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে, রোগী পরিষেবার স্বার্থে হাসপাতাল সুপারের প্রয়োজন আরও অনেক বেশি। কারণ, সুপারের অফিসে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সমস্যার সুরাহা চেয়ে রোজ আসেন। সেসব সমাধানের দায়িত্ব থাকে সুপারের হাতে। অথচ মেডিকেলে গত প্রায় তিন মাস ধরে সুপার নিয়মিত না বসায় এ সবকিছুই অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
সুপারের কার্যালয়ে একজন অতিরিক্ত, দুজন ডেপুটি ও তিনজন সহকারী সুপার রয়েছেন। অভিযোগ, যেদিন থেকে সুপার কলেজ অধ্যক্ষ হয়ে অফিস বদল করেছেন, সেদিন থেকেই বাকিরাও ‘আসি যাই মাইনে পাই’ মেজাজে চলছেন। সরকারি নিয়মে সকাল ১০টার মধ্যে সমস্ত আধিকারিক, কর্মীদের পৌঁছে যাওয়ার কথা। অথচ দুপুর সাড়ে ১২টাতেও সুপার অফিস কার্যত গড়ের মাঠ। এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক সাড়ে ১২টার পর অফিসে আসেন। অভিযোগ, তিনি নাকি মানুষের সমস্যা শুনে সমাধানের পথ বাতলানোর চেয়ে মোবাইলে ভিডিও গেম খেলায় বেশি ব্যস্ত থাকেন। বাকি কর্মীরা ইচ্ছে হলে অফিসে বসেন, নয়তো ছুটির আমেজে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ প্রতিটি ঘরে বাতানুকূল যন্ত্র চালু থাকছে। ভনভন করে ঘুরছে পাখা।
সুপারের দাবি, ‘আমি অধ্যক্ষের অফিসে যেমন বসি, মাঝেমধ্যে সুপার অফিসেও যাই। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সই করানোর জন্য সেখানকার কর্মীরা কলেজে নিয়ে আসেন। সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
সুশ্রুতনগর নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক দিবাকর সরকারের কথায়, ‘এখানে রোগী পরিষেবায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু সুপার অধ্যক্ষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে গোটা হাসপাতালের রোগী পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্য আধিকারিকরাও অফিসে অনিয়মিত। আমরা খুব তাড়াতাড়ি এই ইস্যুটি নিয়ে আন্দোলনে নামব।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, রোগী পরিষেবায় গাফিলতি ও সরকারি কর্মীদের ফাঁকিবাজির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা হবে।
